আটক হওয়া শিক্ষার্থী ও বিক্ষোভকারীদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছে বিবিসি। তাঁদের অভিযোগ, বিক্ষোভ চলাকালে আটক করার সময় এবং পুলিশের হেফাজতে তাঁদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হয়েছে। কাউকে ধাক্কা দিয়ে বাসে তোলা হয়েছে, কাউকে চড়-থাপ্পড় ও লাথি মারা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কয়েকজনের দাবি, তাঁদের চুল টানা, চিমটি কাটা এবং গলা চেপে ধরার মতো ঘটনাও ঘটেছে।
বিবিসি জানিয়েছে, এসব অভিযোগের বিষয়ে দিল্লি পুলিশের বক্তব্য জানতে চাওয়া হলেও প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
আম্বেদকর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী এবং স্টুডেন্টস ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ার (এসএফআই) সদস্য শরণ্যা শর্মাকে গত ১১ অক্টোবরের বিক্ষোভ চলাকালে আটক করা হয়। তাঁর অভিযোগ, পুলিশ সদস্যরা তাঁকে ধাক্কা দিয়ে একটি বাসে তুলে দেন। এ সময় নারী পুলিশ সদস্যরা তাঁর পোশাক টেনে তোলেন এবং পুরুষ কমান্ডোরা জোর করে তাঁকে বাসে ওঠানোর চেষ্টা করেন।
শরণ্যা বিবিসিকে বলেন, ‘একজন নারী পুলিশকর্মী আমার টি-শার্ট টেনে মাথার উপরে তুলে দিয়েছিল। আমাকে অপমান করার জন্যই করেছিল।’
তাঁর আরও অভিযোগ, পুলিশ সদস্যরা তাঁর চুল ধরে টানেন। যে বাসে তাঁকে তোলা হয়েছিল, সেটির ভেতর পর্যাপ্ত আলো-বাতাস প্রবেশের ব্যবস্থাও ছিল না। বাসটির ভেতরে কয়েকটি ছোট খোপ ছিল বলেও জানান তিনি।
বাসে তোলার সময় কী ঘটেছিল, তা বর্ণনা করতে গিয়ে শরণ্যা বলেন, ‘যখন আমাকে ঠেলে ঢোকানো হচ্ছিল, আমি পুরোপুরি ভেতরে যেতে পারিনি। আমার পা তখনও বাইরে ছিল। কমান্ডোরা লোহার দরজা বন্ধ করে দেয় আর আমার পা দরজায় আটকে যায়। ভেতরে থাকা চারটে মেয়ে চিৎকার করছিল। তারা বলছিল, ওর পা আটকে গেছে।
‘তারা অনুরোধ করছিল, এক মিনিটের জন্য দরজাটা খুলে দিন। তাহলে ও ভেতরে ঢুকতে পারবে। কিন্তু পরের ৩০ সেকেন্ড ধরে আমার দ্বিগুণ আকারের তিনজন পুরুষ ওই দরজা জোর করে ঠেলতে থাকে।’
শরণ্যার ভাষ্য অনুযায়ী, সকাল আনুমানিক ১১টার দিকে তাঁকে আটক করে নাঙ্গলোইয়ের একটি আটককেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। গভীর রাতে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়। ওই কেন্দ্রে অবস্থানের সময় খাবার, পানীয় জল এবং শৌচাগারের মতো ন্যূনতম সুবিধারও অভাব ছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এসএফআইয়ের দিল্লি সভাপতি এবং ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের শিক্ষার্থী নাদিয়াকেও গত ১০ অক্টোবরের বিক্ষোভের সময় আটক করা হয়েছিল। তাঁর সঙ্গে বিবিসির দেখা হওয়ার সময় শরীরে আঘাতের চিহ্ন ছিল। এরপরও ১২ অক্টোবর ইন্ডিয়া জোটের বিক্ষোভে অংশ নেন তিনি।
নাদিয়ার অভিযোগ, আটকের সময় নারী পুলিশ সদস্যরা তাঁর চুল টেনেছেন এবং চিমটি কেটেছেন। পুলিশ তাঁর মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে তিনি বাধা দেন। আর সেই বাধা দেওয়ার কারণেই তাঁকে মারধর করা হয় বলে দাবি করেন তিনি।
ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে নাদিয়া বলেন, ‘পুরো বাসে আমি ছাড়া অন্য একটা মেয়ে ছিল। এবারের আটকের ঘটনা খুবই কষ্টদায়ক ছিল। জেনেশুনে পুলিশকর্মীরা টেনে টেনে বাসে তুলছিল, চিমটি কাটছিল। পা দিয়ে মারছিল আমাদের, গলা চেপে ধরে বসানো হচ্ছিল। সেই সময়ে বাসে আমি আর অন্য মেয়েটা ছাড়া একজন পুরুষ পুলিশকর্মী আর পাঁচজন নারী পুলিশ ছিল।’
তাঁর দাবি, একপর্যায়ে তাঁর গলা চেপে ধরারও চেষ্টা করা হয়। তরুণ-তরুণীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিতেই এভাবে বিক্ষোভকারীদের আটক করা হচ্ছে বলে মনে করেন তিনি।
নাদিয়া বলেন, ‘বাসে যেতে যেতে পুলিশকর্মীরা আমাদের কাছে জানতে চায় আমরা কোথায় থাকি, ক্যাজুয়ালি কথা বলছিল। আজ আর তোমরা বাড়ি ফিরতে পারবে না বলে ভয় দেখাতে থাকে। আমি ফোন বের করে রেকর্ড করতে গেলে একজন ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। আমি বাধা দেওয়ার চেষ্টা করি এবং ফোন ফেরত নিই।’
এরপরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘তারপরের ১৫ মিনিট আমার উপর নৃশংসতা হয়েছে। অত্যাচার চালানোর মতোই ছিল সেটা। (হাতের আঘাত দেখিয়ে) এগুলো আঘাতের চিহ্ন। এগুলো মূলত টানা হেঁচড়ার সময় হয়েছে। কিন্তু তার পরেরটুকু খুবই খারাপ ছিল (অন্য হাতের কালসিটে পড়া দাগ দেখিয়ে)। মূলত চারজন পুলিশকর্মী আমার উপর চড়াও হন।’
নাদিয়ার অভিযোগ, ওই পুলিশ সদস্যদের কেউ তাঁকে চিমটি কাটছিলেন, কেউ চুল ধরে টানছিলেন। এ সময় অন্য এক নারী পুলিশ সদস্য বাসে থাকা দ্বিতীয় মেয়েটিকে শাসাচ্ছিলেন বলেও দাবি করেন তিনি।
আটকের সময় ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ তুলে নাদিয়া বলেন, ‘আমি খুব ভয় পেয়েছিলাম। ওরা আমাকে বলছিল, তোমাকে আধমরা অবস্থায় ছাড়ব। আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম, কত মারবে আমাকে? উত্তরে বলেছিল এখান থেকে আধমরা অবস্থায় ফিরবে তুমি।’
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া অন্য নারীদেরও হেনস্তা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন নাদিয়া। তাঁর ভাষ্য, কয়েকজন নারীর শার্ট টেনে মাথার ওপর তুলে দেওয়া হয়েছিল, যাতে তাঁরা অপমানিত বোধ করেন।
নাদিয়ার মতে, তরুণ-তরুণীদের মধ্যে ভীতি তৈরি করার উদ্দেশ্যেই এ ধরনের আচরণ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়া নিয়ে যেসব প্রশ্ন উঠছে, তা বৃহত্তর গণতান্ত্রিক আন্দোলনেরই অংশ। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে জবাবদিহি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের বিক্ষোভ চলবে বলেও জানান তিনি।
দিল্লিতে পিএইচডি করছেন নোভেল। হাতে ভগৎ সিংয়ের পোস্টার নিয়ে গত ১০ অক্টোবরের বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে তাঁকে পুলিশ আটক করছে এবং তাঁর কাছ থেকে পোস্টারটি নিয়ে নিচ্ছে—এমন দৃশ্য দেখা যায়।
নোভেলের অভিযোগ, তাঁকে দিল্লি ট্রান্সপোর্ট করপোরেশনের কমলা রঙের একটি বাসে বসিয়ে রাখা হয়েছিল। সেখানে প্রায় তিন ঘণ্টা অবস্থানের সময় পুলিশ সদস্যরা তাঁকে বারবার চড় মারেন বলে দাবি করেন তিনি। বাসে তখন তিনি একাই ছিলেন। এ পরিস্থিতিতে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন বলেও জানান নোভেল।
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, ‘চার পাঁচজন মিলে আমাকে তাড়া করেছিল। তারা বলতে থাকে বাসে চলো কিছু হবে না। আমি প্রথমে বাধা দিইনি। আমি বাসের কাছে যেতেই কয়েকজন পুলিশ বলে ওঠে—এই ছেলেটার সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি হয়েছে, একে ধর, একে ধর। তারপর আমাকে ধাক্কা দিয়ে তোলা হয়। ওই বাসটা কিন্তু পুলিশের প্রিজন ভ্যান ছিল না।’
নোভেলের দাবি, বাসটি পুলিশের সদস্যদের যাতায়াতের জন্য ব্যবহৃত হতো। সেখানে তাঁকে জোর করে তোলার পর ধাক্কা দেওয়া হয় এবং তিনি পড়ে গেলে কয়েকজন পুলিশ সদস্য মিলে মারধর করেন।
তিনি বলেন, ‘এটা পুলিশের বাস ছিল, তাদের যাতায়াতের জন্য ছিল। আমাকে বাসে টেনে তোলা হয়, ধাক্কা দেওয়া হয়। আমি পড়ে যাই, আর পড়ে যেতেই তিন-চারজন পুলিশ মিলে আমাকে ক্রমাগত মারতে থাকে।’
নোভেলের ভাষ্য অনুযায়ী, বাসটি কোথাও যায়নি; একই জায়গায় দাঁড় করানো ছিল। প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে এভাবে তাঁকে হয়রানি করা হয়। প্রতি ১০ থেকে ১৫ মিনিট পরপর পুলিশ সদস্যরা এসে তাঁকে চড় মারতেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
নোভেল বলেন, ‘আমি বহুবার আটক হয়েছি কিন্তু এই প্রথমবার আমি ভয় পেয়েছিলাম। কারণ ওরা বলছিল—বাসে তুমি একা আছ। কেউ জানতেও পারবে না তোমার সঙ্গে কী ঘটেছে?’
তিনি জানান, পুলিশ সদস্যদের বারবার ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন। নিজের পরিচয় দিয়ে তিনি তাঁদের বলেন, তিনি পিএইচডি করছেন এবং পাশাপাশি শিক্ষকতাও করেন। তাঁর বাবাও সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। তবে এসব জানানোর পরও মারধর বন্ধ হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। প্রায় তিন ঘণ্টা পর তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়।
নিজের ওপর হামলার বিবরণ দিতে গিয়ে নোভেল আরও বলেন, ‘প্রিজন ভ্যানে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে আমার মুখে একজন ঘুষি মারে। আমি মাটিতে পড়ে যাই আর আমি দেখলাম ওই ভ্যানে চার-পাঁচটা খুপরি ছিল।’
তাঁর অভিযোগ, ভ্যানে থাকা পুলিশ সদস্য ও কমান্ডোরা পর্যায়ক্রমে তাঁকে মারধর করেন। তিনি বলেন, ‘ভ্যানে তিনজন পুলিশ এবং একজন কমান্ডো ছিল। একজন আমাকে মারধর করল তারপর অন্যজনের কাছে আমাকে ঠেলে দিল। সে আমার যৌনাঙ্গে বুট দিয়ে মারে। তারপর তৃতীয় জনের কাছে আমাকে ঠেলে দেওয়া হয়। সে আমার বুকে লাথি মারে। তারপর চতুর্থজন আমার গলা টিপে ধরে। তারপর আমাকে ওই প্রিজন ভ্যানের খুপরিগুলোর মধ্যে একটাতে পাঠানো হয়। আমি বাধা দিইনি কারণ আমি জানতাম এর পরিণতি কী হবে।’
অর্জুন নামের আরেক ব্যক্তিও বাসে আটক থাকা কয়েকজন নাবালকের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ তুলেছেন। তাঁর দাবি, ওই নাবালকদের মধ্যে কয়েকজন আহত হয়েছিল, এমনকি কারও কারও হাড় ভেঙে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। পুলিশ এমনভাবে আঘাত করছিল, যাতে শরীরে সহজে দৃশ্যমান দাগ না থাকে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তবে বিক্ষোভকারীদের এসব অভিযোগের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি সীমাবদ্ধতার কথাও জানিয়েছে বিবিসি। ভুক্তভোগীদের অনেকেই সংবাদমাধ্যমটিকে ভিডিও দেখিয়েছেন। কিন্তু সেসব ভিডিও ও বক্তব্যের ভিত্তিতে অভিযোগগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে ১০ ও ১১ অক্টোবরের বিক্ষোভের খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে একাধিক সাংবাদিককেও আটক করা হয়েছিল বলে জানা গেছে। কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে)-এর তথ্য অনুযায়ী, দিল্লি, আহমেদাবাদ ও পুনেতে অন্তত ৩৭ জন সাংবাদিককে আটক করা হয়। তাঁদের মধ্যে ৩৫ জনেরও বেশি ছিলেন দিল্লির সাংবাদিক।
সিপিজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আটক সাংবাদিকদের মধ্যে ‘স্ক্রল’, ‘বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড’, ‘নিউজলন্ড্রি’ এবং ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস হিন্দি’-এর সাংবাদিকরাও ছিলেন।
গত ১০ অক্টোবর আটক হওয়া সাংবাদিকদের মধ্যে ছিলেন ‘স্ক্রল.ইন’-এর শোয়েব দানিয়াল ও আয়ুষ তিওয়ারি, ‘বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড’-এর অনুষ্কা ভরদ্বাজ এবং ‘নিউজলন্ড্রি’-র অশ্বিনী কুমার সিং, আস্থা সব্যসাচী ও অনমোল প্রীতম। নিউজলন্ড্রির প্রতিবেদন অনুযায়ী, আটক সাংবাদিকদের মোবাইল ফোনও জব্দ করা হয়েছিল।
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, পুলিশি পদক্ষেপের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের ভয় দেখানো হচ্ছে। অন্যদিকে, এসব অভিযোগের বিষয়ে দিল্লি পুলিশের বক্তব্য পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে বিবিসি। ফলে আটক ব্যক্তিদের বর্ণনা ও দেখানো আঘাতের চিহ্ন সামনে এলেও অভিযোগগুলোর পূর্ণাঙ্গ সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাইয়ের বিষয়টি এখনো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে রয়েছে।
