চীনের সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়, চিংদাও ইনস্টিটিউট অব মেরিন জিওলজি এবং সাংহাই জিয়াও টং বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের যৌথ অভিযানে এই মূল্যবান খনিজের সন্ধান পাওয়া যায়। গবেষকরা সমুদ্রতলের একটি হাইড্রোথার্মাল এলাকায় অভিযান চালিয়ে স্বর্ণ ও রুপার উচ্চ ঘনত্বের নমুনা সংগ্রহ করেন। হাইড্রোথার্মাল এলাকায় সাধারণত ভূগর্ভের অত্যন্ত উত্তপ্ত ও খনিজসমৃদ্ধ তরল পদার্থ সমুদ্রতলের ফাটল দিয়ে ওপরে উঠে আসে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন ধরনের ধাতব খনিজ জমা হতে থাকে।
অভিযানের সময় গবেষকরা সমুদ্রতলে শঙ্কু আকৃতির, ত্রিমাত্রিক তিনটি বড় খনিজ স্তর বা হাইড্রোথার্মাল সালফাইডের সন্ধান পান। সাধারণত এ ধরনের খনিজ স্তরে তামা, দস্তা ও সিসার মতো ধাতুর পাশাপাশি অল্প পরিমাণে স্বর্ণ ও রুপা পাওয়া যায়। কিন্তু এবার সংগৃহীত নমুনাগুলোতে মূল্যবান এই দুই ধাতুর পরিমাণ অন্য ধাতুর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি পাওয়া গেছে। এমনকি কিছু নমুনায় স্থলভাগের স্বর্ণ ও রুপার আকরিকের তুলনায়ও বেশি ঘনত্বের উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন গবেষকরা।
প্রাথমিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রতি মার্কিন শর্ট টন আকরিকে স্বর্ণের ঘনত্ব সর্বোচ্চ ০.৪৫ ট্রয় আউন্স পর্যন্ত পাওয়া গেছে। একই পরিমাণ আকরিকে রুপার ঘনত্ব পাওয়া গেছে সর্বোচ্চ ৩৬.৩ ট্রয় আউন্স। অন্য হিসাবে, কিছু নমুনায় প্রতি টন আকরিতে স্বর্ণের পরিমাণ ১৫ দশমিক ৪ গ্রাম এবং রুপার পরিমাণ ১ হাজার ২৭১ গ্রাম পর্যন্ত পাওয়া গেছে।
গবেষণা দলের অন্যতম প্রধান বিজ্ঞানী সং শিজি বলেন, বিশাল এই সমুদ্রতলের খনন এলাকায় ‘অত্যন্ত উচ্চ অর্থনৈতিক মূল্য’ রয়েছে। গবেষকদের মতে, ওই অঞ্চলে থাকা বহু ধাতব সালফাইডের সম্ভাব্য মজুত বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রতলীয় খনিজ মজুতগুলোর সমপর্যায়ের হতে পারে।
এই আবিষ্কারের জন্য চীনা গবেষকরা দীর্ঘ সময় ধরে সমুদ্রতলে অনুসন্ধান চালান। গত ১০ আগস্ট শেনজেন থেকে চীনের গবেষণা জাহাজ ‘শিয়াং ইয়াং হং ১০’-এ করে ১৮ দিনের অভিযান শুরু করেন তারা। অভিযানের সময় গবেষকরা সাবমার্সিবল ব্যবহার করে মোট সাতবার সমুদ্রের গভীরে ডুব দেন। পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের একটি ব্যাক-আর্ক বেসিনে পরিচালিত এই অনুসন্ধানের সময়ই বিশাল হাইড্রোথার্মাল খনিজ এলাকার সন্ধান পাওয়া যায়।
সামুদ্রিক চলাচলসংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, অভিযানের সময় গবেষণা জাহাজটি তাইওয়ানের উত্তর ও পূর্বাঞ্চল এবং ফিলিপাইনের উত্তরের জলসীমা দিয়ে চলাচল করেছে। চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, যে বেসিন এলাকায় এই খনিজের সন্ধান মিলেছে, সেটি চীনের একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলের (ইইজেড) মধ্যে অবস্থিত। তবে আবিষ্কৃত খনিজ এলাকার সুনির্দিষ্ট স্থানাঙ্ক এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
সমুদ্রের তলদেশে এ ধরনের বিপুল খনিজ সম্পদের সন্ধান ভবিষ্যতে মূল্যবান ধাতু উত্তোলনের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকরা। তবে গভীর সমুদ্রে খনন কার্যক্রম শুরু হলে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য, পরিবেশ ও সমুদ্রের বাস্তুতন্ত্রের ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিতর্ক রয়েছে। ফলে আবিষ্কৃত এই বিপুল খনিজ সম্পদ অর্থনৈতিকভাবে কতটা কাজে লাগানো সম্ভব হবে, তা নির্ভর করবে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, পরিবেশগত ঝুঁকি এবং সমুদ্রতলের খননসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক বিধিবিধানের ওপর।
