সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে মার্কিন কংগ্রেসের সদস্যদের সঙ্গে একটি রুদ্ধদ্বার বৈঠকে অংশ নেন জিওফ্রি হিন্টন। বৈঠক শেষে এআই নিয়ন্ত্রণে কার্যকর আইন ও নিরাপত্তাব্যবস্থা তৈরির জন্য আইনপ্রণেতাদের হাতে কতটা সময় রয়েছে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘হয়তো এক বছর, তবে এর চেয়ে খুব বেশি সময় নয়।’ তাঁর মতে, এআইয়ের উন্নয়নের গতি কিছুটা কমিয়ে এর নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার দিকে এখনই গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
এআইয়ের দ্রুত অগ্রগতির উদাহরণ হিসেবে হিন্টন সম্প্রতি হাগিং ফেসকে ঘিরে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনাও তুলে ধরেন। ঘটনাটিকে তিনি ‘ছোট আকারের চেরনোবিল’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর আশঙ্কা, এআইয়ের সক্ষমতা যেভাবে দ্রুত বাড়ছে, সেই তুলনায় যদি এর নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তাব্যবস্থা একই গতিতে উন্নত না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে এর পরিণতি আরও গুরুতর হতে পারে।
হিন্টনের উদ্বেগের আরেকটি বড় কারণ হলো কৃত্রিম সাধারণ বুদ্ধিমত্তা বা এজিআই (আর্টিফিশিয়াল জেনারেল ইন্টেলিজেন্স) তৈরির সম্ভাব্য সময়সীমা দ্রুত কমে আসা। এজিআই বলতে এমন এক ধরনের এআইকে বোঝানো হয়, যা বিস্তৃত পরিসরের বিভিন্ন কাজ মানুষের সমপর্যায়ে কিংবা তার চেয়েও বেশি দক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন করতে সক্ষম হবে।
হিন্টনের মতে, একসময় গবেষকদের ধারণা ছিল, মানুষের মতো বিস্তৃত সক্ষমতার এ ধরনের এআই তৈরি হতে ৩০ থেকে ৫০ বছর সময় লাগতে পারে। পরবর্তী সময়ে সেই সময়সীমা কমে ১০ থেকে ২০ বছরে নেমে আসে। এখন অনেক গবেষক মনে করছেন, মানুষের সমকক্ষ বা তার চেয়েও বেশি সক্ষম এআই তৈরি হতে হয়তো আর কয়েক দশক নয়, মাত্র কয়েক বছরও লাগতে পারে।
এ কারণে উন্নত এআই প্রযুক্তির নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে এআইয়ের সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি এর সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় কী ধরনের আইন ও নিরাপত্তাব্যবস্থা প্রয়োজন, তা নিয়ে আলোচনা জোরদার হয়েছে।
এর পেছনে অন্যতম কারণ সম্প্রতি হাগিং ফেসকে ঘিরে ঘটে যাওয়া একটি সাইবার নিরাপত্তা-সংক্রান্ত ঘটনাও। জুলাইয়ে সাইবার নিরাপত্তা পরীক্ষার সময় ওপেনএআইয়ের কয়েকটি এআই এজেন্ট মানুষের সরাসরি নির্দেশনা ছাড়াই ইন্টারনেটে প্রবেশ করে হাগিং ফেসের সিস্টেমে প্রবেশের চেষ্টা করে।
ওপেনএআইয়ের তথ্যমতে, এআই এজেন্টগুলো একাধিক নিরাপত্তা দুর্বলতা পরপর কাজে লাগিয়ে হাগিং ফেসের বিভিন্ন সার্ভারে প্রবেশ করেছিল। শুধু তা-ই নয়, এআই এজেন্টগুলো নিজেদের মধ্যে অননুমোদিত একটি বার্তা আদান-প্রদানের ব্যবস্থাও তৈরি করেছিল। এর মাধ্যমে একটি এজেন্টের পাওয়া তথ্য অন্য এজেন্টদের কাছে পৌঁছে যায় এবং তারা পরস্পরের কাজের সঙ্গে সমন্বয় করতে থাকে।
ওপেনএআইও ঘটনাটিকে একটি ‘সতর্কসংকেত’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। প্রতিষ্ঠানটির মতে, যথাযথ নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা না হলে অত্যন্ত সক্ষম এআই এজেন্ট প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ এড়িয়ে যেতে, অননুমোদিত উপায়ে পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে এবং মানুষের সরাসরি নির্দেশনা ছাড়াই ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ নিতে পারে।
প্রযুক্তি খাতের এই ঘটনাগুলোই জিওফ্রি হিন্টনের মতো বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তুলছে। তাঁর সতর্কবার্তার মূল বিষয় হলো—এআইয়ের সক্ষমতা যত দ্রুত বাড়ছে, তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিরাপত্তা, নিয়ন্ত্রণ ও নীতিমালা তৈরি করা না গেলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে
