রায়হান চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি ইউনিয়নের সাতগড় নোয়াপাড়া এলাকার সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক নাজিম উদ্দীনের ছেলে। সাত মাস আগে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর গত ১৩ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ১২টার দিকে ঐতিহ্যবাহী চুনতি সীরাত মাহফিল এলাকায় এক পায়ে ভর দিয়ে ভিক্ষা করার সময় স্থানীয় কয়েকজন তাকে চিনতে পারেন। খবর পেয়ে দ্রুত সেখানে ছুটে যান রায়হানের বাবা। পরে ছেলেকে উদ্ধার করে বাড়িতে নিয়ে আসেন তিনি।
ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে রায়হান জানায়, চুল কাটানোর জন্য বাড়ি থেকে বের হয়ে সে কক্সবাজার চলে যায়। সেখানে কয়েকজন ছেলের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। পরে তাদের সঙ্গে ট্রেনের ছাদে চড়ে সে কমলাপুর রেলস্টেশনে যায়। সেখান থেকে কয়েকজন লোক তাকে এমন একটি জায়গায় নিয়ে যায়, যার চারপাশে ছিল বাগান এবং মাঝখানে একটি ঘর। সেখানে তার মতো আরও অনেক ছেলে-মেয়ে ছিল বলে দাবি করে রায়হান।
রায়হানের ভাষ্য, একদিন রাতে ওই জায়গায় ঘুমিয়ে থাকার পর সকালে ঘুম থেকে উঠে সে দেখতে পায় তার একটি পা নেই। পা কীভাবে কাটা হলো জানতে চাইলে তাকে বলা হয়, সে নাকি ট্রেন দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে।
এরপর তাকে প্রতিদিন হুইলচেয়ারে বসিয়ে ভিক্ষা করানো হতো বলে দাবি করে রায়হান। ভিক্ষা করে পাওয়া টাকা একটি প্লাস্টিকের ব্যাংকে জমা রাখা হতো। সেখানে দুজন পুরুষ ও সালমা নামের এক নারী ছিল বলেও জানায় সে। রায়হানের দাবি, ওই জায়গায় থাকা আরও অনেকেরই হাত-পা কাটা ছিল। একপর্যায়ে তাকে একটি বাসে তুলে দেওয়া হলে সে চুনতি সীরাত মাহফিল এলাকায় এসে পৌঁছায়।
ঢাকায় গিয়ে মামলা করার সামর্থ্য নেই: রায়হানের বাবা
রায়হানের বাবা নাজিম উদ্দিন বলেন, তার ছেলে হেফজখানায় পড়াশোনা করত। কিছুটা দুষ্টুমি করায় মাঝে মাঝে তাকে পানের ক্ষেতে কাজেও নিয়ে যেতেন। সাত মাস আগে ১০০ টাকা দিয়ে চুল কাটাতে পাঠানোর পর আর বাড়ি ফেরেনি রায়হান।
নাজিম উদ্দিনের দাবি, পরে তার ছেলেকে কক্সবাজার থেকে কমলাপুরে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানে তার একটি পা কেটে ভিক্ষাবৃত্তিতে নামানো হয়।
তিনি বলেন, সীরাত মাহফিলে একজন লোক রায়হানকে দেখে তাকে খবর দেন। খবর পেয়ে সেখানে গিয়ে ছেলেকে দেখার পর বাবা-ছেলে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তবে পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে রায়হান নিখোঁজ হওয়ার পর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে পারেননি বলেও জানান তিনি।
সন্তানের এই করুণ অবস্থার বিষয়ে লোহাগাড়া থানায় আইনি সহায়তা চাইতে গিয়ে সহযোগিতা না পাওয়ার অভিযোগও করেন নাজিম উদ্দিন।
তার ভাষ্য, রায়হান বাড়িতে ফিরে আসার পর সে যা জানিয়েছে, তা নিয়ে থানায় অভিযোগ করতে গেলে পুলিশ জানায় ঘটনাটি কমলাপুরে ঘটেছে। তাই সংশ্লিষ্ট থানায় যোগাযোগ করতে বলা হয়। কিন্তু দিন এনে দিন খাওয়া একজন দরিদ্র মানুষ হিসেবে ঢাকায় গিয়ে মামলা বা অভিযোগ করার মতো আর্থিক সামর্থ্য তার নেই বলে জানান তিনি।
‘কোন পাষাণরা আমার নিষ্পাপ বাচ্চাটার এই হাল করল’
রায়হানের সৎমা ফয়জুন্নেসা বলেন, তার ছেলে চুল কাটাতে গিয়ে সাত মাস বাড়ির বাইরে ছিল। এতদিন পর তাকে ফিরে পেলেও দেখতে হয়েছে ভয়াবহ অবস্থায়—একটি পা নেই, পেটেও বড় অস্ত্রোপচারের দাগ।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘কোন পাষাণরা আমার নিষ্পাপ বাচ্চাটার এই হাল করল?’ তাদের পরিবার অটোরিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ছেলেটির স্বাভাবিক জীবন এখন কীভাবে ফিরবে, সেটাই তাদের সবচেয়ে বড় চিন্তা।
রায়হানের সঙ্গে এমন নিষ্ঠুরতার জন্য দায়ীদের কঠোর শাস্তি দাবি করেছেন তিনি। একই সঙ্গে সরকারের কাছে ঘটনাটি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন।
মাহফিলে রায়হানকে চিনে ফেলেন স্থানীয়রা
সীরাত মাহফিলে রায়হানকে প্রথম দেখতে পাওয়া স্থানীয় বাসিন্দা নুরুন্নবী বলেন, রাত ১২টার পর মাহফিলের ভিড়ের মধ্যে এক পায়ে ভর দিয়ে একটি শিশুকে ভিক্ষা করতে দেখেন তিনি। মুখটি পরিচিত মনে হওয়ায় কাছে গিয়ে নাম জিজ্ঞেস করেন।
তখন শিশুটি কান্নাজড়িত কণ্ঠে নিজেকে ‘নাজিম মিয়ার ছেলে রায়হান’ বলে পরিচয় দেয়। বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর স্থানীয়রা বিস্মিত হয়ে যান।
নুরুন্নবী বলেন, সাত মাস আগে যে রায়হান সুস্থ-সবল অবস্থায় নিখোঁজ হয়েছিল, তাকে এমন পঙ্গু অবস্থায় দেখে মাহফিলে উপস্থিত অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। পরে দ্রুত তার বাবাকে খবর দেওয়া হয়।
‘এটি চরম মানবতাবিরোধী কাজ’
স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. তৈয়ুবুল্লাহ বলেন, রায়হানের পরিবার অত্যন্ত সাধারণ ও দরিদ্র। তার বাবা অটোরিকশা চালিয়ে সংসার চালান। এমন পরিবারের ১২ বছরের একটি শিশুর সঙ্গে যে বর্বরতা করা হয়েছে, তা কল্পনাও করা যায় না।
তিনি বলেন, ঘটনাটি শুধু একটি অপরাধ নয়, এটি চরম মানবতাবিরোধী কাজ। এর সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের দ্রুত শনাক্ত করে গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান তিনি।
মানবাধিকারকর্মী দেলোয়ার হোসেন রশিদীও ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, শিশুটিকে দেখে তিনি অত্যন্ত মর্মাহত হয়েছেন। রায়হানের বক্তব্য অনুযায়ী, একটি চক্র তার জীবনকে ধ্বংস করে দিয়েছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
তিনি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নিতে সরকার ও প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান।
থানায় অভিযোগ না নেওয়ার অভিযোগ
রায়হানের পরিবারকে আইনি সহায়তা না দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে লোহাগাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আবদুল্লাহ ও পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) প্রশান্ত কুমার ভৌমিক জানান, রায়হান সাত মাস আগে বাড়ি থেকে নিখোঁজ হলেও তার পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় কোনো অভিযোগ বা সাধারণ ডায়েরি করা হয়নি।
পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) প্রশান্ত কুমার ভৌমিক বলেন, পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রায়হান কক্সবাজারে প্রায় এক মাস ছিল। পরে তাকে কমলাপুরে নিয়ে যাওয়া হয়। এ কারণে সংশ্লিষ্ট থানায় যোগাযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
নিখোঁজ থাকার সময় ভিডিও প্রকাশ
এদিকে, রায়হান নিখোঁজ থাকার সময় কমলাপুর রেলস্টেশনে এক কনটেন্ট ক্রিয়েটর তার একটি ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেছিলেন। ওই ভিডিওতে রায়হানকে বলতে দেখা যায়, জায়গা-সংক্রান্ত একটি মামলায় তার বাবা কারাগারে এবং সৎমা তাকে মারধর করায় সে ট্রেনের ছাদে চড়ে ঢাকায় চলে এসেছে।
তবে রায়হানের স্বজনরা এই বক্তব্য নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তাদের দাবি, ভয় দেখিয়ে কিংবা কারও শেখানো কথা অনুযায়ী শিশুটিকে দিয়ে ওই ভিডিওতে এমন বক্তব্য বলানো হয়ে থাকতে পারে।
শিশু নিখোঁজের ঘটনায় বড় উদ্বেগ
মানবাধিকার আইনজীবী ও বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের (বিএইচআরএফ) মহাসচিব অ্যাডভোকেট জিয়া হাবীব আহসান বলেন, দেশে শিশু নিখোঁজের ঘটনাগুলোকে এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তার দাবি, গত সাত মাসে প্রায় ১৪ হাজার শিশু এভাবে নিখোঁজ হয়েছে এবং এর পেছনে সংঘবদ্ধ চক্রের সম্পৃক্ততার আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি বলেন, নিখোঁজ শিশুদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কেটে নেওয়া বা তাদের বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, সেটি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা প্রয়োজন। রাষ্ট্র ও প্রশাসনকে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
বিএইচআরএফের দাবি অনুযায়ী, পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সারা দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশুর নিখোঁজ-সংক্রান্ত সাধারণ ডায়েরি হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ শিশুকে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও এখনো ২ হাজার ৩৮ শিশু নিখোঁজ রয়েছে। নিখোঁজ শিশুদের বড় একটি অংশের বয়স ১০ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে বলে জানানো হয়েছে।
বিএইচআরএফের চেয়ারপার্সন অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেন, নিখোঁজ প্রতিটি শিশুর ঘটনাকে আলাদা ও বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। শিশু পাচার, অঙ্গ পাচার এবং ভিক্ষাবৃত্তিতে বাধ্য করার চক্রের সম্ভাবনাকে সামনে রেখে তদন্ত করতে হবে।
তিনি নিখোঁজ শিশুদের দ্রুত শনাক্ত করতে ‘মুন অ্যালার্ট’-এর মতো জরুরি সতর্কতা ব্যবস্থা দেশব্যাপী কার্যকর করার পাশাপাশি নিখোঁজ শিশুদের তথ্য নিয়ে একটি সমন্বিত জাতীয় ডাটাবেজ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন।
রায়হানের ঘটনা ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলোর সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া জরুরি। একই সঙ্গে তার মতো নিখোঁজ শিশুদের সন্ধান, উদ্ধার এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে—এমন প্রত্যাশা পরিবার ও মানবাধিকারকর্মীদের।
