সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে ২০টির বেশি ব্যবসায়ী সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভা শেষে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান মাহদী আমিন।
তিনি বলেন, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর লক্ষ্যে বিদ্যুৎ, গ্যাস, জ্বালানি এবং খনিজ সম্পদ নিয়ে সভায় বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। বৈঠকে ব্যবসায়ী নেতাদের সামনে বিদ্যুৎ ও গ্যাস খাতের জন্য সরকারের দুই, পাঁচ ও ১০ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে।
মাহদী আমিন জানান, বর্তমানে দেশে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউ রয়েছে। এর মধ্যে একটি দীর্ঘদিন ধরে অচল অবস্থায় ছিল। সেটি মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের এলএনজি টার্মিনালের সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। প্রথম পর্যায়ে টার্মিনালের সংখ্যা তিনটিতে এবং পরবর্তী সময়ে পাঁচটিতে উন্নীত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ২০২৮ সাল শুরুর আগেই তৃতীয় এফএসআরইউ যুক্ত করার চেষ্টা চলছে। শিল্প ও ব্যবসা খাতে জ্বালানির চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। সেই চাহিদা পূরণে আমদানিনির্ভরতার পাশাপাশি দেশের নিজস্ব গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
গ্যাস অনুসন্ধানে গুরুত্ব
গ্যাসের সরবরাহ বাড়াতে শুধু এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভর না করে দেশের অভ্যন্তরে নতুন গ্যাসের সন্ধান ও উত্তোলন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান মাহদী আমিন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ১৫০টি গ্যাসকূপ খননের প্রক্রিয়া চলছে। এসব কূপ খননের কাজ শেষ হওয়ার পর পর্যায়ক্রমে আরও ১৫০টি কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এর মাধ্যমে দেশে গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি শিল্প ও ব্যবসা খাতে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হবে।
এর পাশাপাশি স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ, গ্যাস সঞ্চালন ও বিতরণ নেটওয়ার্কের সক্ষমতা বাড়ানো এবং অবকাঠামো সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনে সৌরশক্তিকে অগ্রাধিকার
বিদ্যুৎ খাতের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরে মাহদী আমিন বলেন, তেল, গ্যাস ও কয়লার পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। বিভিন্ন জ্বালানি উৎসের সমন্বয়ে একটি বৈচিত্র্যময় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
তিনি বলেন, দেশের জ্বালানি সম্পদে স্বনির্ভরতা অর্জনের পাশাপাশি সৌরশক্তিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে। সরকারের লক্ষ্য এমন একটি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে শিল্প ও ব্যবসা খাতে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত হবে এবং একই সঙ্গে বিভিন্ন উৎস থেকে জ্বালানি পাওয়ার সুযোগ থাকবে।
নীতি সহায়তা দেবে সরকার, বাস্তবায়নে বেসরকারি খাত
মতবিনিময় সভায় ব্যবসায়ী নেতারা বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি সরবরাহসহ বিভিন্ন সমস্যা ও নিজেদের প্রস্তাব তুলে ধরেছেন বলে জানান মাহদী আমিন।
তিনি বলেন, দেশের শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে ব্যবসায়ী ও বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ এবং ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকার প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তা ও অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করবে, আর বেসরকারি খাত সেসব সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিনিয়োগ ও শিল্প সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখবে।
মাহদী আমিন বলেন, সরকারি ও বেসরকারি খাতকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা বিভিন্ন সমস্যার কারণে অর্থনীতিতে যে পুঞ্জীভূত সংকট তৈরি হয়েছে, তা একদিন, এক মাস কিংবা এক বছরে পুরোপুরি সমাধান করা সম্ভব নয়। তবে এসব সমস্যা সমাধানে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে দায়বদ্ধতা, আন্তরিকতা এবং সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে।
ব্যবসায়ীদের বিদ্যমান সমস্যাগুলোকে নতুন সম্ভাবনার ক্ষেত্র হিসেবেও দেখছে সরকার বলে জানান তিনি। ব্যবসায়ী সংগঠন ও অ্যাপেক্স বডিগুলোর সঙ্গে সরকারের সহযোগিতা আরও বাড়ানো হবে। ভবিষ্যতেও এ ধরনের মতবিনিময় সভা ধারাবাহিকভাবে আয়োজনের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
বৈঠকে ২০টির বেশি ব্যবসায়ী সংগঠন
সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় সরকারের পক্ষ থেকে বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী; অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা; বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী; প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা; বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর; বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) চেয়ারম্যান; প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের সচিবরা উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া পেট্রোবাংলা ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) চেয়ারম্যানরাও বৈঠকে অংশ নেন।
ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর মধ্যে এফবিসিসিআই, ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স বাংলাদেশ (আইসিসিবি), বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ, মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই), ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফআইসিসিআই), ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই), চট্টগ্রাম চেম্বার, বিজিএমইএ, বিকেএমইএ এবং বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
এ ছাড়া ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ, বাংলাদেশ অ্যাগ্রো-প্রসেসরস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ প্লাস্টিক গুডস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ সিরামিক ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ টেরি টাওয়েল অ্যান্ড লিনেন ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস, বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন এবং রিহ্যাবের শীর্ষ নেতারাও সভায় অংশ নেন।
এ ছাড়া বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরাও মতবিনিময় সভায় উপস্থিত ছিলেন।
