এনসিপির এই নতুন সমীকরণের বিপরীতে দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক শক্তি বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী নিজেদের পছন্দের প্রার্থীদের নিয়ে নির্বাচনী ছক সাজাতে ব্যস্ত সময় পার করছে। দল দুটির পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়নি। তবে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে তাদের অবস্থান অনেকটাই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয় হওয়ায় বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী সরাসরি দলীয় প্রতীকে প্রার্থী দেবে না। বরং তারা নিজেদের পছন্দের প্রার্থী বাছাই করে তাদের সমর্থন দেবে। ফলে ব্যালটে দলীয় প্রতীক না থাকলেও ভোটের মাঠে বিএনপি ও জামায়াতের সাংগঠনিক সমর্থন এবং রাজনৈতিক প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিএনপির প্রার্থী প্রায় চূড়ান্ত
বিএনপির উচ্চপর্যায়ের সূত্রগুলো বলছে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে মেয়র পদে মো. শফিকুল ইসলাম খান এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে মো. আবদুস সালামের নাম প্রায় চূড়ান্ত করেছে দলটি।
গত ২২ ফেব্রুয়ারি স্থানীয় সরকার বিভাগের এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাদের দুই সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
দলীয় সূত্রের ভাষ্য, প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার সময়ই নাগরিক সেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের সিটি করপোরেশন নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। ফলে বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে সমর্থন ঘোষণা না করলেও দুই সিটিতে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে তাদের নিয়ে দলের মধ্যে তেমন কোনো টানাপোড়েন নেই।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালাম বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নেওয়ার আগে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্জীব হয়ে পড়েছিল। এখন সে অবস্থার অনেক পরিবর্তন হয়েছে। চেষ্টা করছি, নাগরিকদের সুযোগ-সুবিধাগুলো নিশ্চিত করার।’
নির্বাচন ও নাগরিক সেবা—দুই দিক থেকেই প্রস্তুতি নেওয়ার কথা জানিয়ে আবদুস সালাম বলেন, ‘জনগণ যা চায়, সে অনুযায়ী কাজ করার চেষ্টা করছি। এর মধ্য দিয়ে নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি।’
তবে বিএনপির একজন দায়িত্বশীল নেতা জানিয়েছেন, আপাতত এই দুজনের নামই ঠিক আছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কী হবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা কঠিন। এর মধ্যে বিভিন্ন মাধ্যমে জরিপ চালিয়ে প্রার্থী বাছাই করা হতে পারে বলেও জানান তিনি।
জামায়াতের প্রার্থীও প্রায় চূড়ান্ত
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর পছন্দের প্রার্থীরাও অনেকটা নিশ্চিত। দলটি ঢাকা উত্তরে মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন এবং দক্ষিণে মো. আবু সাদিক—যিনি সাদিক কায়েম নামে পরিচিত—কে সমর্থন দেবে বলে জানা গেছে।
মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগর উত্তরের শাখার আমির। অন্যদিকে সাদিক কায়েম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ—ডাকসুর ভিপি। গত জুলাই মাস পর্যন্ত তিনি ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক ছিলেন। বর্তমানে তিনি জামায়াতে ইসলামীর সহযোগী সদস্য।
এর আগে সেলিম উদ্দিন সিলেট-৬ (গোলাপগঞ্জ-বিয়ানীবাজার) আসন থেকে সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে পরাজিত হন। অন্যদিকে সাদিক কায়েমের নির্বাচনী পরিচিতি মূলত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাজনীতিকেন্দ্রিক।
সেলিম উদ্দিন বেশ কিছুদিন ধরে ঢাকা উত্তর সিটির বিভিন্ন এলাকায় সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি বিভিন্ন সেবামূলক কার্যক্রম চালিয়ে আসছেন। একইভাবে সাদিক কায়েমও জামায়াতের ঘরোয়া কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন এবং সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে তৎপরতা চালাচ্ছেন।
জামায়াতে ইসলামীর একজন দায়িত্বশীল নেতা জানিয়েছেন, সাদিক কায়েম যেহেতু এখনো ডাকসুর প্রতিনিধিত্ব করছেন, সে কারণে জামায়াতে তার সক্রিয় অংশগ্রহণ এখনো প্রকাশ্যে খুব বেশি দেখা যাচ্ছে না।
জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা সদস্য মু. আতাউর রহমান সরকার বলেন, ‘মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে যাচ্ছেন এবং তিনি খুব সাড়া পাচ্ছেন। আমরা আশাবাদী, নগরবাসী তাকে বিজয়ী করে তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে এগোবেন।’
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারও এ বিষয়ে কথা বলেছেন। সোমবার ঢাকায় দলীয় এক অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে তারা সাংগঠনিকভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
তিনি বলেন, ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা ও সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন পর্যায়ে প্রার্থী মনোনয়নের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনেও দলীয়ভাবে প্রার্থী মনোনীত করা হয়েছে, তবে এখনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের সূত্র উল্লেখ করে তিনি জানান, ঢাকা উত্তরে মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন এবং দক্ষিণে সাদিক কায়েমকে প্রার্থী হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে।
প্রথম নির্বাচনী পরীক্ষায় আসিফ, আবার ভোটের মাঠে পাটওয়ারী
ঢাকার দুই সিটিতে এনসিপি সরাসরি প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করেছে। গত রোববার দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং দক্ষিণে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর নাম ঘোষণা করেন।
আসিফ মাহমুদের জন্য এটি সরাসরি নির্বাচনী রাজনীতিতে প্রথম বড় পরীক্ষা। এর আগে সংসদ কিংবা স্থানীয় সরকারের কোনো নির্বাচনে তিনি অংশ নেননি।
অন্যদিকে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে। ঢাকা-৮ আসনে বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা মির্জা আব্বাসের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনি পরাজিত হন।
সিটি নির্বাচনকে সামনে রেখে আসিফ মাহমুদ ও নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী নিজেদের ভোটার এলাকাও পরিবর্তন করেছেন। আসিফ মাহমুদ উত্তর সিটির ৩৭ নম্বর ওয়ার্ডে এবং নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী দক্ষিণ সিটির ২১ নম্বর ওয়ার্ডে ভোটার হয়েছেন। এরপরই তাদের দুই সিটিতে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়।
তিন দলের তিন ধরনের প্রার্থী
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, তিনটি রাজনৈতিক দলই ঢাকার দুই সিটিতে ভিন্ন ধরনের প্রার্থী সামনে এনেছে।
বিএনপি সামনে রাখছে সিটি প্রশাসনের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন দুই ব্যক্তিকে। জামায়াতের উত্তর সিটির প্রার্থী নগর সংগঠনের পরিচিত নেতা, আর দক্ষিণের প্রার্থী ছাত্ররাজনীতির পরিচিত মুখ। অন্যদিকে এনসিপি বেছে নিয়েছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সম্মুখসারির দুই মুখকে।
বিএনপির দক্ষিণের সম্ভাব্য প্রার্থী আবদুস সালামও একজন অভিজ্ঞ সংগঠক। তিনি দীর্ঘ সময় মহানগর দক্ষিণে দলের অন্যতম শীর্ষ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত মেয়রের দায়িত্বও পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য।
অন্যদিকে বিএনপির উত্তরের সম্ভাব্য প্রার্থী শফিকুল ইসলাম খান জাতীয়তাবাদী যুবদলের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি। গত সংসদ নির্বাচনে তিনি ঢাকা-১৫ আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ওই নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর আমির মো. শফিকুর রহমানের কাছে পরাজিত হন।
এদিকে জামায়াতের উত্তরের প্রার্থী মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন দীর্ঘদিন ধরে নগরভিত্তিক সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয়। দক্ষিণে সাদিক কায়েমের পরিচিতি তৈরি হয়েছে মূলত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাজনীতির মাধ্যমে।
আর এনসিপির দুই প্রার্থী আসিফ মাহমুদ ও নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী জুলাই গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার পরিচিত মুখ।
বিএনপির অবস্থান
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, বিএনপি কোনো প্রার্থীকে দলীয়ভাবে মনোনয়ন দেবে না। তবে তৃণমূল পর্যায়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, স্থানীয়ভাবে যিনি জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য, তাকে ঐক্যবদ্ধভাবে ভোট দিয়ে বিজয়ী করার জন্য।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, নির্দলীয় নির্বাচনে দলীয় প্রতীক না থাকায় প্রার্থীদের ব্যক্তিগত পরিচিতি, জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। একই সঙ্গে বিএনপি ও জামায়াতের সাংগঠনিক সমর্থন ভোটের ফলাফলে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে, সেটিও বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সব মিলিয়ে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচন এখন তিন রাজনৈতিক শক্তির জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের বড় পরীক্ষায় পরিণত হতে পারে। প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা, শক্তিশালী দলীয় সংগঠন নাকি নতুন রাজনৈতিক পরিচিতি—ভোটারদের কাছে শেষ পর্যন্ত কোন বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পায়, তার উত্তর মিলবে নির্বাচনের ফলাফলে।
