চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনের পর গ্রেপ্তার তিন আসামির দেওয়া জবানবন্দির ভিত্তিতে এসব তথ্য জানিয়েছেন কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান। রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) দুপুরে জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত ঘটনা তুলে ধরেন।
গ্রেপ্তার তিন আসামি হলেন—তুহিন, ফাহাদ ও কামরুল। এছাড়া এ ঘটনায় জড়িত থাকার সন্দেহে সিয়াম নামের আরও একজনকে আটক করা হয়েছে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান জানান, অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে করা সাধারণ ডায়েরির (জিডি) সূত্র ধরে তদন্ত শুরু করে পুলিশ। তদন্তের অংশ হিসেবে আশপাশের বিভিন্ন এলাকার সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা হয়। ফুটেজ পর্যালোচনা করে পুলিশ দেখতে পায়, গত ১৮ সেপ্টেম্বর দুপুর আনুমানিক ২টা থেকে সোয়া ২টার মধ্যে তুহিন অপ্রতিমকে সঙ্গে নিয়ে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার পাহাড়ঘেরা একটি নির্জন বনের ভেতরে যায়।
অপ্রতিমের মৃত্যুর খবর আনুষ্ঠানিকভাবে পাওয়ার আগেই প্রযুক্তির সহায়তায় তুহিনকে নজরদারির আওতায় আনে পুলিশ। পরে তাকে পুলিশ হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। একটানা জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে তুহিন অপ্রতিমকে নির্জন ওই স্থানে নিয়ে যাওয়ার কারণ এবং হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ জানায়, অপ্রতিমের দামি আইফোনটি হাতিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যেই তাকে পরিকল্পিতভাবে নির্জন ওই স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। এই পরিকল্পনার সঙ্গে তুহিনের পাশাপাশি ফাহাদ ও কামরুলও সরাসরি জড়িত ছিল। তুহিনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ তাৎক্ষণিক অভিযান চালিয়ে ফাহাদকে গ্রেপ্তার করে। পরে ফাহাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কামরুলকেও গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশ সুপার হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা দিতে গিয়ে জানান, ঘটনার দিন বিকেল ৫টা থেকে ৬টার মধ্যে সানন্দা এলাকার গহিন জঙ্গলে অপ্রতিমের কাছ থেকে আইফোনটি কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এ সময় অপ্রতিম ফোনটি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে শক্তভাবে বাধা দেয়। একপর্যায়ে তাকে ও অভিযুক্তদের মধ্যে হাতাহাতি ও ধস্তাধস্তি শুরু হয়।
ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে প্রথমে তুহিন এবং পরে ফাহাদ ও কামরুল বাঁশের ভারী লাঠি দিয়ে অপ্রতিমের মাথায় এলোপাতাড়ি আঘাত করে। উপর্যুপরি আঘাতে অপ্রতিম গুরুতর আহত হয়ে একপর্যায়ে নিস্তেজ হয়ে পড়ে। পরে তার মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর অভিযুক্তরা সেখান থেকে আইফোনটি নিয়ে পালিয়ে যায় বলে পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে।
ঘটনার পর অপ্রতিমের মরদেহ নির্জন ওই পাহাড়ি জঙ্গলে ফেলে রেখে যায় অভিযুক্তরা। অন্যদিকে, অপ্রতিমের কাছে থাকা দামি আইফোনটি নিজেদের দখলে নেয় তারা। পরে পুলিশ তদন্তে নেমে একে একে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করে।
ফোন উদ্ধারের বিষয়ে পুলিশ জানায়, গ্রেপ্তারের পর তুহিন তদন্ত কর্মকর্তাদের বিভ্রান্ত করতে প্রথমে ভুল তথ্য দেওয়ার চেষ্টা করে। তার দেওয়া বিভ্রান্তিকর তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ তিনটি ভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করেও আইফোনটির সন্ধান পায়নি। পরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে একপর্যায়ে সে প্রকৃত তথ্য জানায়।
তুহিনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরবর্তীতে তার নিজ বাড়িতে অভিযান চালিয়ে অপ্রতিমের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া আইফোনটি উদ্ধার করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান বলেন, অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় প্রধান তিন অভিযুক্তকে ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের দেওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয়ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ ঘটনায় আরও কেউ জড়িত ছিল কি না, কিংবা হত্যাকাণ্ডের পেছনে অন্য কোনো কারণ বা কারও মদত রয়েছে কি না, সে বিষয়েও তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে পুলিশ।
তিনি আরও জানান, মামলার তদন্ত দ্রুততম সময়ের মধ্যে শেষ করে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) জমা দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। আলোচিত রামিসা হত্যা মামলার মতো অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের বিচারও যেন দ্রুত নিষ্পত্তি হয়, সে বিষয়ে আদালতে বিশেষ আবেদন জানানো হবে।
পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তির ভূমিকা তদন্তের মাধ্যমে চিহ্নিত করা হবে এবং ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
