রহমত আলী জানান, প্রতিদিন তাঁর আয় হয় প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা। এর মধ্যে নৌকার ভাড়া বাবদ প্রতিদিন দিতে হয় ১২০ টাকা। মাঝিরা যদি ধোপাঘাট থেকে যাত্রী ওঠান, তাহলে দিতে হয় ১০০ টাকা। আর বাদামতলী থেকে যাত্রী ওঠালে দিতে হয় ৫০ টাকা। দুই পাড় থেকেই যাত্রী ওঠালে এই টাকা বেড়ে দাঁড়ায় ১৫০ টাকায়। এ কারণে কোনো কোনো মাঝি দুই ঘাট থেকে যাত্রী না তুলে শুধু একটি ঘাট থেকে যাত্রী নেন। যাত্রীদের ওপারে নামিয়ে দিয়ে পরে খালি নৌকা নিয়ে ফিরে আসেন। এর বাইরে নৌকা পাহারা দেওয়ার নামেও প্রতিদিন দিতে হয় ১৫ টাকা।
মাঝিদের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে এভাবেই তাঁদের কাছ থেকে বিভিন্ন নামে টাকা আদায় করা হচ্ছে। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দেশের বিভিন্ন স্থানে যেমন চাঁদা আদায়ের নিয়ন্ত্রণ বদলায়, বুড়িগঙ্গার ঘাটগুলোতেও চাঁদা নেওয়ার লোকজনের পরিবর্তন ঘটে। তবে মাঝিদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার এই প্রক্রিয়া বন্ধ হয়নি।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) সূত্রে জানা গেছে, বুড়িগঙ্গা নদীর নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে কেরানীগঞ্জের জিনজিরা টিনপট্টিঘাট পর্যন্ত মোট ১৭টি ঘাট রয়েছে। এসব ঘাটে পণ্যবাহী ও যাত্রীবাহী বিভিন্ন ধরনের নৌযান থামে। এর মধ্যে ১৫টি ঘাটের ৪৪টি জায়গা থেকে ডিঙিনৌকার মাধ্যমে যাত্রী পারাপার করা হয়। কোনো কোনো ঘাটে ইঞ্জিনচালিত নৌকাও চলাচল করে।
বিআইডব্লিউটিএ বিভিন্ন ঘাট ইজারা দিয়ে থাকে। সংস্থাটির ট্যারিফ শিডিউলে ডিঙিনৌকা থেকে টাকা আদায়ের বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো ফি উল্লেখ করা হয়নি। অন্যান্য নৌযানের জন্য নির্ধারিত ফি থাকলেও ডিঙিনৌকার ক্ষেত্রে এমন কোনো ফি নির্ধারণ করা নেই।
তবে ঘাটের ইজারাদারেরা মাঝিদের কাছ থেকে বিভিন্ন হারে টাকা আদায় করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। গত ৫ ও ৬ জুলাই এবং ৩ ও ৬ সেপ্টেম্বর বুড়িগঙ্গা নদীর ১৫টি ঘাটের ১৮টি জায়গায় গিয়ে ডিঙিনৌকার মাঝিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাঁদের কাছ থেকে দৈনিক ৩৫ টাকা থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে।
বিআইডব্লিউটিএর ঘাটগুলোতে ডিঙিনৌকা থেকে এ ধরনের টাকা আদায়ের নিয়ম আছে কি না জানতে চাইলে সংস্থাটির যুগ্ম পরিচালক মোবারক হোসেন মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, ট্যারিফ শিডিউলে ডিঙিনৌকায় যাত্রী পারাপারের বিষয়ে নির্দিষ্ট করে কোনো কিছু বলা নেই। তবে নৌকায় মালামাল বহনের বিষয়ে সেখানে উল্লেখ রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে নৌকার মাঝি ও ইজারাদারেরা সমঝোতার ভিত্তিতে একটা ফি নির্ধারণ করে নৌকা চালান। আমার কাছে অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার কোনো অভিযোগ আসেনি।’
তবে নৌকার মাঝিদের ভাষ্য ভিন্ন। তাঁদের দাবি, চাঁদা না দিয়ে তাঁদের কোনো উপায় নেই। কোনো মাঝি টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাঁকে মারধর করার ঘটনাও ঘটে। তাঁদের অভিযোগ, ডিঙিনৌকার জন্য ট্যারিফ শিডিউলে নির্দিষ্ট ফি না থাকায় ঘাটের ইজারাদারেরা নিজেদের মতো করে টাকা আদায়ের সুযোগ পাচ্ছেন।
ঢুকতেও টাকা, বের হতেও টাকা
বুড়িগঙ্গার ওপার থেকে ব্যবসা-বাণিজ্যসহ বিভিন্ন কাজে প্রতিদিন বহু মানুষ ঢাকা মহানগরে আসেন। একইভাবে পুরান ঢাকা ও আশপাশের এলাকা থেকেও অনেকে কেরানীগঞ্জসহ নদীর অপর পাড়ে যাতায়াত করেন। তাঁদের জন্য সহজ ও দ্রুত যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম ডিঙিনৌকা।
কারণ, সেতু দিয়ে যাতায়াত করতে হলে অনেকটা পথ ঘুরে গন্তব্যে যেতে হয়। ফলে সময় ও খরচ—দুই দিক বিবেচনায় নদীপথের ছোট নৌকার ওপর নির্ভর করেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
সদরঘাটের আশপাশের বিভিন্ন ঘাটে ডিঙিনৌকায় যাত্রী পারাপারে জনপ্রতি ১০ টাকা ভাড়া নেওয়া হয়। আবার কিছু ঘাটে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় জনপ্রতি ৫ টাকা করে নেওয়া হয়।
তবে অভিযোগ রয়েছে, কোনো কোনো ঘাটে যাত্রীদের শুধু নৌকা ভাড়া নয়, ঘাটে প্রবেশ ও বের হওয়ার সময়ও টাকা দিতে হয়। যেমন সদরঘাটের ওয়াইজঘাট-আগা নগর খেয়াঘাটে জনপ্রতি প্রবেশ ফি হিসেবে ৫ টাকা নেওয়া হয়। আবার ঘাট থেকে বের হওয়ার সময়ও জনপ্রতি আরও ৫ টাকা করে আদায় করা হচ্ছে।
বিআইডব্লিউটিএর ট্যারিফ শিডিউল অনুযায়ী, খেয়াঘাটে প্রবেশের জন্য একজন যাত্রীর কাছ থেকে দুই টাকা করে টোল নেওয়ার নিয়ম রয়েছে। তবে বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই এই নির্ধারিত হার মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।
কেরানীগঞ্জের আগা নগরের বাসিন্দা মো. ইব্রাহীম পুরান ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালের কর্মচারী। প্রতিদিন তিনি ডিঙিনৌকায় করে বুড়িগঙ্গা নদী পার হয়ে কর্মস্থলে যান।
তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ঘাটের অবস্থা এমন যে ঘুরতে-ফিরতে বিভিন্ন জায়গায় টাকা দিতে হয়। ঘাটের লোকজনের সঙ্গে এসব টাকা দেওয়া নিয়ে প্রায়ই তাঁদের ঝগড়ায় জড়াতে হয়।
মাঝিরা জানান, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আগে তাঁদের কাছ থেকে প্রতিদিন ৬০ টাকা করে নেওয়া হতো। গণ-অভ্যুত্থানের পর কয়েক মাস টাকা নেওয়া বন্ধ ছিল। পরে আবার ২০ টাকা করে নেওয়া শুরু হয়। পর্যায়ক্রমে সেই টাকা বাড়তে বাড়তে এখন ১০০ টাকায় দাঁড়িয়েছে।
ইজারাদার কারা
কেরানীগঞ্জের ধোপাঘাটে গত ৫ জুলাই বিকেল চারটার দিকে গিয়ে দেখা যায়, প্রবীণ এক ব্যক্তি খাতা হাতে নিয়ে নৌকার মাঝিদের কাছ থেকে টাকা আদায় করছেন। তাঁর নাম চিত্তরঞ্জন। পরিচয় জানতে চাইলে তিনি জানান, তিনি ঘাটের ব্যবস্থাপক। ঘাটের ‘খাজনা’ ও নৌকাভাড়ার টাকা তিনি আদায় করেন।
ধোপাঘাট থেকে যাত্রী নেওয়া ডিঙিনৌকার মাঝিদের প্রতিদিন ১০০ টাকা করে দিতে হয়। তবে এই টাকা আদায়ের বিষয়টি বিআইডব্লিউটিএর ট্যারিফ শিডিউলে উল্লেখ নেই।
মাঝিরা জানান, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আগে তাঁদের কাছ থেকে দিনে ৬০ টাকা করে নেওয়া হতো। গণ-অভ্যুত্থানের পর কয়েক মাস টাকা নেওয়া বন্ধ ছিল। এরপর ২০ টাকা করে নেওয়া শুরু হয়। ধীরে ধীরে সেই টাকা বাড়িয়ে ১০০ টাকা করা হয়েছে।
ধোপাঘাটের ইজারাদার আগা নগর ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক মেরাজ হোসেন (জুম্মন)। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘গতবার (২০২৫-২৬) আমি ঘাট ইজারা নিয়ে লোকসান গুনেছি। তাই এবার মাঝিদের সঙ্গে আলোচনা করে খাজনা বৃদ্ধি করেছি।’
অন্যদিকে, ওয়াইজ ঘাট থেকে যাত্রী নেওয়ার জন্য নৌকাপ্রতি দৈনিক ৩৫ টাকা করে দিতে হয় বলে মাঝিরা জানান। আর ইঞ্জিনচালিত নৌকার ক্ষেত্রে প্রতিবার ৩০ টাকা করে নেওয়া হয়।
এই ঘাটের ইজারাদার ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শ্রমিক দলের আহ্বায়ক সুমন ভূঁইয়া। তাঁর মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
নৌকার মাঝি ও বিআইডব্লিউটিএ সূত্রে জানা গেছে, বুড়িগঙ্গার বিভিন্ন ঘাটের ইজারাদারদের বেশির ভাগই ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মী।
মাঝিরা নৌকার মালিক হতে পারেন না
১৯৯৮ সালে বরিশাল থেকে ঢাকায় এসে বুড়িগঙ্গা নদীতে নৌকা চালানো শুরু করেন রমজান আলী। দীর্ঘ সময় ধরে নৌকা চালালেও তাঁর নিজের কোনো নৌকা নেই। তিনি অন্যের নৌকা ভাড়া নিয়ে চালান।
অথচ ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকার মধ্যেই একটি ডিঙিনৌকা কেনা সম্ভব। নিজের নৌকা কেনেননি কেন—এমন প্রশ্নের জবাবে রমজান আলী প্রথম আলোকে বলেন, টাকা থাকলেও মাঝিরা সহজে নৌকা কিনতে পারেন না। এখানে নৌকা নামানোর ক্ষেত্রেও প্রভাব থাকতে হয়। কোনো মাঝি নিজের নৌকা কিনলে সেটি চুরি হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মাঝিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা দামের একটি নৌকা থেকে দিনে ১২০ টাকা করে মাসে প্রায় ৩ হাজার ৬০০ টাকা আয় হতে পারে। সে হিসাবে নৌকার মালিকানা একটি লাভজনক ব্যবসা। মাঝিদের অভিযোগ, এ কারণেই স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা নৌকার মালিকানা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখেন।
মাঝিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আগা নগর ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের মেরাজুল হোসেনের একারই প্রায় ৪০টি নৌকা রয়েছে।
বুড়িগঙ্গার ডিঙিনৌকার ঘাটগুলোর এই চিত্রকে দেশজুড়ে অপ্রাতিষ্ঠানিক ব্যবসা ও পরিবহন খাতের ওপর রাজনৈতিক এবং পেশিশক্তির নিয়ন্ত্রণের একটি উদাহরণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। যাঁদের দায়িত্ব ঘাটে চাঁদাবাজি বন্ধ করে সাধারণ মানুষের স্বল্প খরচে যাতায়াত নিশ্চিত করা, তাঁদের কেউ কেউ ‘অভিযোগ আসেনি’—এমন বক্তব্য দিয়ে দায়িত্ব এড়িয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
ফলে নির্ধারিত নিয়মের
