এর মধ্যে গত ৩১ আগস্ট রাজধানীর ইউনাইটেড হেলথকেয়ারে রোবোটিক সার্জারির মাধ্যমে চিকিৎসাসেবায় নতুন এক ধাপের সূচনা হয়। ওই দিন হাসপাতালটির এন্ডো-ল্যাপারোস্কপিক অ্যান্ড রোবোটিক সার্জারি বিভাগের ভিজিটিং কনসালট্যান্ট এবং অ্যাডভান্সড এন্ডো-ল্যাপারোস্কপিক সেন্টারের পরিচালক অধ্যাপক রফিকুস সালেহীন রোবটের সহায়তায় একজন পুরুষ রোগীর পিত্তথলি অপসারণ করেন।
একই দিনে হাসপাতালের প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগের প্রধান ও চিফ কনসালট্যান্ট অধ্যাপক সামছাদ জাহান রোবটের সহায়তায় এক নারী রোগীর জরায়ু অপসারণ করেন।
এদিকে মায়াস্থেনিয়া গ্র্যাভিসে আক্রান্ত শিশুটিও একই হাসপাতালের কার্ডিয়াক সার্জারি বিভাগের সিনিয়র কনসালট্যান্ট অধ্যাপক মোফাসসেল উদ্দীন আহমেদের তত্ত্বাবধানে ছিল। শিশুটির পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন তিনি। ওই দিন সন্ধ্যায় শিশুটির পরিবার হাসপাতালে আসে। পরে ২ সেপ্টেম্বর রোবটের সহায়তায় অধ্যাপক মোফাসসেল উদ্দীন আহমেদ শিশুটির প্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার করেন।
এ অস্ত্রোপচারে শিশুটির বুক কাটতে হয়নি। ছোট ছোট ছিদ্রের মাধ্যমে পুরো অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করা হয়।
অস্ত্রোপচারের পরদিন সকালেই চিকিৎসকের সঙ্গে ফুটবল খেলতে নামে শিশুটি। অধ্যাপক মোফাসসেল উদ্দীন আহমেদ বলেন, ‘প্রচলিত ধারায় এ ধরনের অস্ত্রোপচারের পর দেড় মাস আমরা ভারী কাজ করতে দিই না। তিন মাস পরে রোগীকে বাইরে বেরোতে দিই। ছয় মাস পরে খেলাধুলার প্রসঙ্গ আসে। আর এখানে শিশুটি পরদিন সকালেই ফুটবল খেলেছে। যেহেতু সার্জনের সঙ্গেই খেলেছে, সার্জন নিরাপদ নিশ্চিত হয়েই পারমিশন দিয়েছেন।’
‘এক নতুন অধ্যায়’
অনেকের ধারণা, রোবোটিক সার্জারিতে রোবট নিজেই স্বাধীনভাবে অস্ত্রোপচার করে। তবে চিকিৎসকেরা বলছেন, ধারণাটি সঠিক নয়। রোবোটিক সার্জারি মূলত রোবটের সহায়তায় চিকিৎসকের করা অস্ত্রোপচার।
অধ্যাপক রফিকুস সালেহীন বলেন, রোবোটিক সার্জারিতেও সার্জনের ভূমিকাই মুখ্য। রোবট এখানে সহায়ক হিসেবে কাজ করে। প্রচলিত অস্ত্রোপচারে সার্জন নিজ হাতে যেসব কাজ করেন, রোবোটিক পদ্ধতিতে সেসব কাজে রোবোটিক বাহু সহায়তা করে। তবে ওই বাহুগুলোও সার্জনই নিয়ন্ত্রণ করেন।
সার্জনের সামনে থাকে ‘থ্রিডি মনিটর’। এর মাধ্যমে তিনি সরাসরি অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ত্রিমাত্রিক দৃশ্য দেখতে পান। সেই দৃশ্য দেখে সার্জন রোবোটিক বাহুগুলো পরিচালনা করে অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করেন।
পদ্ধতিটি অনেকটা ল্যাপারোস্কপিক সার্জারির মতো হলেও রোবোটিক সার্জারিতে ব্যবহৃত যন্ত্রগুলো তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি নমনীয়। এতে ‘৩৬০ ডিগ্রি নড়াচড়া’র সুবিধা পাওয়া যায়। ফলে শরীরের নির্দিষ্ট ও জটিল স্থানে আরও সূক্ষ্মভাবে অস্ত্রোপচার করা সম্ভব হয়।
রফিকুস সালেহীন বলেন, ‘বিশ্বের অনেক দেশে আগে থেকেই এটা (রোবোটিক সার্জারি) ছিল। আমরা একটু পিছিয়ে ছিলাম। আমি বলব, এই অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে আমাদের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো।’
ইউনাইটেড হেলথকেয়ারে ব্যবহৃত রোবটটির নাম ‘মেডবট তুমাই এন্ডোস্কোপিক সার্জিক্যাল রোবট’। চীনে তৈরি এ রোবটের ব্যবহার শিখতে চিকিৎসকেরা দুই দফায় চীনে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। প্রশিক্ষণের বিভিন্ন পর্যায়ে কৃত্রিম অঙ্গ ও প্রাণীর অঙ্গে অস্ত্রোপচারের অনুশীলন করেন তাঁরা। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের চিকিৎসকেরা চীনের চিকিৎসকদের সঙ্গে মানুষের অস্ত্রোপচারেও অংশ নেন।
এরপর তাঁরা রোবোটিক সার্জারির সার্টিফিকেট অর্জন করেন। মেডবট রোবটটি ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশে আনা হয়। তবে অস্ত্রোপচারের জন্য তখন সরকারি অনুমতি ছিল না। অনুমতি পাওয়ার পর গত মাসে হাসপাতালটিতে প্রথম রোবোটিক অস্ত্রোপচার করা হয়।
রফিকুস সালেহীন জানান, ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হাসপাতালটিতে ১২ জন রোগীর রোবোটিক সার্জারি করা হয়েছে। তাঁদের প্রত্যেকেই সুস্থ আছেন।
দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফেরা
ইউনাইটেড হেলথকেয়ারের ইউরোলজি বিভাগের প্রধান ও কনসালট্যান্ট হাসিনা সাদিয়া খান রোবটের সহায়তায় এক রোগীর পাইলোপ্লাস্টি করেন। কিডনির সঙ্গে মূত্রনালির সংযোগস্থলের সংকীর্ণতা দূর করার এ অস্ত্রোপচারের রোগীর বয়স ছিল ১৭ বছর।
হাসিনা সাদিয়া খান বলেন, ‘শিশুটি ছিল চিকন স্বাস্থ্যের। ল্যাপারোস্কপির জন্য প্রশস্ত জায়গা হলে ভালো; কিন্তু এই রোগীর পেটে জায়গা কম ছিল। এ রকম ক্ষেত্রে ভিশন বা কাজের জায়গা পাওয়া যায় না। এই রোগীর জন্য রোবোটিক সার্জারি সবচেয়ে উপযোগী। ভেতরে অনেক সুন্দর করে অল্প জায়গার মধ্যে কাজগুলো করে ফেলা গেছে।’
তিনি জানান, বিশ্বে রোবোটিক সার্জারির ৬০ থেকে ৭০ শতাংশই ইউরোলজিক সার্জারি। গাইনোকোলজিতেও রোবোটিক সার্জারির ব্যবহার বেশি। এসব অস্ত্রোপচার শরীরের খুব ছোট ও জটিল অংশে করতে হয়।
অধ্যাপক সামছাদ জাহান জানান, রোবোটিক সার্জারির একটি বড় সুবিধা হলো অস্ত্রোপচারের সময় শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ও গঠন অনেক বড় করে দেখা যায়। প্রায় ১৫ থেকে ২০ গুণ পর্যন্ত বড় করে দেখার সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি এ পদ্ধতিতে সার্জনের হাতের স্বাভাবিক কাঁপুনি বা ট্রেমর ফিল্টার করা হয়। ফলে আশপাশের টিস্যু তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং আরও নিখুঁতভাবে অস্ত্রোপচার করা সম্ভব হয়।
রোবোটিক সার্জারিতে শরীরে ছোট ছিদ্র করে অস্ত্রোপচার করা হয়। ফলে রক্তপাতও তুলনামূলক কম হয়। একই সঙ্গে ব্যথা ও শারীরিক ধকল কম থাকায় অস্ত্রোপচারের পর রোগী তুলনামূলক কম সময়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন।
এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক মোফাসসেল উদ্দীন আহমেদ বলেন, ‘ধরুন, একজন জনপ্রিয় খেলোয়াড়। তাঁর একটি সার্জারি দরকার। আমরা যদি বুক কেটে অস্ত্রোপচার করে বলি, আগামী ছয় মাস আপনি মাঠে দৌড়াতে পারবেন না, তাহলে কিন্তু তাঁর ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যাবে। এ রকম ক্ষেত্রে রোবোটিক সার্জারি সুবিধাজনক।’
আছে সম্ভাবনা
তবে রোবোটিক সার্জারি তুলনামূলকভাবে ব্যয়বহুল। বাংলাদেশে এ ধরনের অস্ত্রোপচারের খরচ ল্যাপারোস্কপিক সার্জারির তুলনায় দুই থেকে আড়াই গুণ। যদিও বিদেশের তুলনায় এ খরচ এখনো কম। চিকিৎসকদের আশা, দেশে রোবোটিক সার্জারি চালু হওয়ায় ‘মেডিক্যাল ট্যুরিজম’ কমবে এবং দেশের রোগীদের একটি অংশকে বিদেশে চিকিৎসার জন্য যেতে হবে না। এতে দেশের অর্থ দেশেই থাকবে।
চিকিৎসক রফিকুস সালেহীন বলেন, ‘সিঙ্গাপুরে এই অস্ত্রোপচারের খরচ অনেক বেশি। সেটি তো শুধু হাসপাতালের খরচ। তারপর রোগীর সঙ্গে যিনি গেলেন, তাঁর থাকার খরচ আছে। তো আমরা মনে করি, সবকিছু মেলালে রোগীর জন্য দেশে চিকিৎসা অনেক সুবিধাজনক।’
এই চিকিৎসকের ধারণা, সময়ের সঙ্গে রোবোটিক সার্জারির খরচ আরও কমে আসবে। দেশের বাইরের রোগীরাও তুলনামূলক কম খরচে অস্ত্রোপচার করাতে বাংলাদেশে আসবেন বলে আশা করছেন তিনি।
রোবোটিক সার্জারি চালু হওয়ায় অভিজ্ঞ বিদেশি সার্জনদেরও অস্ত্রোপচারে সরাসরি অংশ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। অধ্যাপক মোফাসসেল উদ্দীন আহমেদ জানান, বিদেশের অভিজ্ঞ সার্জনরা অনলাইনে যুক্ত হতে পারবেন এবং দূর থেকেই জটিল অস্ত্রোপচার তদারকি করতে পারবেন। এমনকি অনুমতি সাপেক্ষে অস্ত্রোপচারে অংশ নেওয়ার সুযোগও থাকবে।
ক্যানসারের অস্ত্রোপচারে রোবোটিক সার্জারির কার্যকারিতা বেশি বলে মনে করছেন চিকিৎসকেরা। আগামী দিনে কোলন, পাকস্থলী, অন্ত্র, কিডনি, প্রোস্টেট ও জরায়ুর অস্ত্রোপচারে এর ব্যবহার আরও বাড়বে বলে আশা করছেন ইউনাইটেড হেলথকেয়ারের চিকিৎসকেরা।
বর্তমানে চিকিৎসকদের রোবোটিক সার্জারির প্রশিক্ষণ নিতে দেশের বাইরে যেতে হয়, যা বেশ ব্যয়বহুল। তবে দেশে এ প্রযুক্তি চালু হওয়ায় অস্ত্রোপচারের পাশাপাশি নতুন চিকিৎসকদেরও দেশেই প্রশিক্ষণ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকেরা।
অধ্যাপক সামছাদ জাহান বলেন, ‘আমি যে ফেলোশিপ (রোবোটিক সার্জারি-সংক্রান্ত) করলাম, অনেক খরচ। আমাদের নতুন ডাক্তারদের পক্ষে সম্ভব না। এখন দেশের স্টুডেন্টদের আমরা নিজেরাই ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করতে পারব। আমার মনে হয় যে এটা আমাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে এবং আমাদের ইচ্ছা আছে।’
