রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার সিদ্ধান্ত জানিয়েছে প্রসিকিউশন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম জানিয়েছেন, আপিলের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ইতোমধ্যে নেওয়া হয়েছে।
এর আগে গত ৩০ জুন ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। তার বিরুদ্ধে মোট আটটি অভিযোগ আনা হয়েছিল। এর মধ্যে তিনটি অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় প্রতিটি অভিযোগে তাকে ১০ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে আইন অনুযায়ী সাজাগুলো একই সঙ্গে কার্যকর হওয়ায় সব মিলিয়ে তাকে মোট ১০ বছরই কারাগারে থাকতে হবে।
ট্রাইব্যুনালের প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলা হয়েছে, ইনুর বিরুদ্ধে আনা ৩, ৬ ও ৭ নম্বর অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। এসব অভিযোগের মধ্যে আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতাকে গুরুতর আহত করা, নির্যাতন এবং রাজনৈতিক কারণে নিপীড়নের ঘটনায় তার দায়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের ষড়যন্ত্র, প্ররোচনা ও সহযোগিতার অভিযোগেও ইনুর দায় প্রমাণিত হয়েছে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়। এসব অভিযোগে তাকে পৃথকভাবে ১০ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দুটি অভিযোগে এক লাখ টাকা করে জরিমানাও করা হয়েছে। তবে সব সাজা একই সময়ে কার্যকর হওয়ায় কারাদণ্ডের মোট মেয়াদ ১০ বছরই থাকবে।
অন্যদিকে, ইনুর বিরুদ্ধে আনা ১, ২, ৪, ৫ ও ৮ নম্বর অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় এসব অভিযোগ থেকে তাকে খালাস দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২।
মামলার অভিযোগপত্র অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই একটি ভারতীয় গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে হাসানুল হক ইনু জুলাই আন্দোলনকারীদের জামায়াত, সন্ত্রাসী ও সাম্প্রদায়িক হিসেবে আখ্যায়িত করেন। একই সঙ্গে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগে উসকানি, প্ররোচনা ও সহযোগিতা এবং তাদের হত্যার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগও আনা হয় তার বিরুদ্ধে।
মামলার দ্বিতীয় অভিযোগে বলা হয়, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই গণভবনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে ১৪ দলীয় জোটের একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমনে ‘শুট অ্যাট সাইট’ বা দেখামাত্র গুলির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। ইনু ওই সভায় উপস্থিত থেকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে নির্দেশ, প্ররোচনা, উসকানি ও সহযোগিতা করেছিলেন বলেও অভিযোগ আনা হয়। তবে এই অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় ট্রাইব্যুনাল তাকে এ অভিযোগ থেকে খালাস দিয়েছেন।
তৃতীয় অভিযোগে বলা হয়, আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার ছবি দেখে তাদের তালিকা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তাদের আটক ও নির্যাতনের জন্য কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপারকে ফোন করে হাসানুল হক ইনু নির্দেশ দিয়েছিলেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। ট্রাইব্যুনালের পূর্ণাঙ্গ রায়ে এই অভিযোগটি প্রমাণিত হয়েছে বলে বলা হয়েছে।
চতুর্থ অভিযোগে আন্দোলন দমনে মারণাস্ত্র ব্যবহারের পাশাপাশি ছত্রীসেনা নামানো এবং হেলিকপ্টার থেকে হামলার পরিকল্পনার সঙ্গে ইনুর সম্পৃক্ততার অভিযোগ আনা হয়। অন্যদিকে, পঞ্চম অভিযোগে গণমাধ্যমে দেওয়া বিভিন্ন বক্তব্যের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে উসকানি এবং সরকার পরিচালিত হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতন-নিপীড়নকে সমর্থনের অভিযোগ করা হয়। তবে চতুর্থ ও পঞ্চম—দুই অভিযোগই প্রমাণিত না হওয়ায় এসব অভিযোগ থেকে তাকে খালাস দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।
ষষ্ঠ অভিযোগে ১৪ দলীয় জোটের সভায় উপস্থিত থেকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণে হাসানুল হক ইনুর ভূমিকার কথা বলা হয়। ট্রাইব্যুনালের পূর্ণাঙ্গ রায়ে এ অভিযোগে তার দায় প্রমাণিত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
সপ্তম অভিযোগে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে টেলিফোনে কথোপকথনের মাধ্যমে ষড়যন্ত্রে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ আনা হয়। ট্রাইব্যুনাল এই অভিযোগও প্রমাণিত বলে পূর্ণাঙ্গ রায়ে উল্লেখ করেছেন।
অষ্টম অভিযোগে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কুষ্টিয়া শহরে আন্দোলনকারী ইউসুফ শেখ, উসামা, সুরুজ আলী, আশরাফুল ইসলাম, বাবলু ফরাজী ও আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিনকে হত্যায় নির্দেশনা দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়। একই সঙ্গে সারাদেশে প্রায় এক হাজার ৪০০ মানুষকে হত্যা এবং ২৫ হাজারের বেশি ছাত্র-জনতাকে আহত করার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগও ছিল এই অভিযোগের আওতায়। তবে অষ্টম অভিযোগটি প্রমাণিত না হওয়ায় ইনুকে এ অভিযোগ থেকেও খালাস দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।
এদিকে হাসানুল হক ইনু শাপলা চত্বর হত্যাযজ্ঞের মামলাতেও বিচারের মুখোমুখি হচ্ছেন। ২০১৩ সালে তথ্যমন্ত্রী থাকাকালে শাপলা চত্বর-সংক্রান্ত কোর কমিটির বৈঠকে তিনি উপস্থিত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই ঘটনায়ও তার বিরুদ্ধে আইনি কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
