ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, শুধু বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতাই নয়—অপরিকল্পিতভাবে সড়ক কাটা, কাজ শেষে দ্রুত মেরামত না করা এবং সংস্কারকাজে ধীরগতিও রাজধানীর সড়কের বেহাল দশার বড় কারণ।
সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, অতিবৃষ্টি, জলাবদ্ধতা ও দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকায় বর্ষায় সড়ক ক্ষতির পরিমাণ বাড়ে। তবে সরেজমিনে দেখা গেছে, অনেক এলাকায় বিভিন্ন উন্নয়নকাজের কারণে সড়ক কেটে রেখে দেওয়া হয়েছে। কোথাও আবার সংস্কারকাজ শুরু হলেও দীর্ঘদিনেও তা শেষ হয়নি।
উত্তর সিটির সড়কে অসংখ্য গর্ত
মোহাম্মদপুরের আসাদ অ্যাভিনিউ থেকে লালমাটিয়ার বি-ব্লক পর্যন্ত জাকির হোসেন সড়কের প্রায় ৩০০ মিটার অংশের বিভিন্ন জায়গায় ভাঙন ও গর্ত দেখা গেছে। সড়কের আরও প্রায় ৩৫০ মিটার অংশ কাজী নজরুল ইসলাম সড়কের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। এসব সড়কের অনেক অংশই এখন বেহাল।
কোথাও পিচ উঠে এবড়োখেবড়ো হয়ে গেছে, কোথাও ছোট-বড় গর্ত। আবার কোথাও সড়ক দেবে তৈরি হয়েছে উঁচু-নিচু অবস্থা। বৃষ্টির পানি জমে থাকায় অনেক গর্তের গভীরতাও বোঝা যায় না।
মিরপুর, আগারগাঁও, শ্যামলী, মোহাম্মদপুর, রায়েরবাজার, ফার্মগেট, গুলশান, বনানী, মহাখালী, তেজগাঁও, বাড্ডা, নর্দ্দা, কুড়িল ও খিলক্ষেতসহ উত্তর সিটির বিভিন্ন এলাকায়ও একই চিত্র দেখা গেছে।
বিশেষ করে প্রগতি সরণির কুড়িল থেকে নর্দ্দা বাজার বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার সড়কের অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। কোথাও গভীর গর্ত, কোথাও দেবে যাওয়া অংশ। ফলে যানবাহন ধীরগতিতে চলছে এবং গর্ত এড়িয়ে চলতে গিয়ে তৈরি হচ্ছে যানজট।
এক সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালকের ভাষ্য, সড়কের বড় গর্তে চাকা পড়লে গাড়ির বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যানজটও বাড়ছে।
‘যাত্রীরা গালাগালি করেন’
বেগম রোকেয়া সরণি, গাবতলী-টেকনিক্যাল মোড় এবং মিরপুর সড়কের বিভিন্ন অংশেও ছোট-বড় গর্ত দেখা গেছে।
গাবতলী-পাটুরিয়া পথে চলাচলকারী এক বাসচালক জানান, সড়কে যানবাহনের চাপ বেশি থাকলে গর্ত এড়িয়ে চলা কঠিন হয়ে পড়ে। গর্তে চাকা পড়লে গাড়িতে প্রচণ্ড ঝাঁকি লাগে, স্টিয়ারিং নিয়ন্ত্রণে সমস্যা হয় এবং সাসপেনশনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বিমানবন্দর সড়কের বিভিন্ন অংশেও পিচ উঠে গেছে। কোথাও ফাটল, কোথাও বৃষ্টির পানি জমে তৈরি হয়েছে গর্ত। ধানমন্ডি ২৭ নম্বর থেকে মোহাম্মদপুর ও বছিলা পর্যন্ত সড়কের বিভিন্ন স্থানেও দেখা গেছে একই দুরবস্থা।
সংস্থাগুলোর কাজ শেষে রাস্তা মেরামত নেই
রাজধানীর সড়কের দুরবস্থার বড় একটি কারণ বিভিন্ন উন্নয়ন ও সেবা সংস্থার কাজ। সড়ক কেটে পাইপ বা অন্য অবকাঠামো বসানো হলেও অনেক সময় কাজ শেষে তা দ্রুত আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়া হয় না।
টেকনিক্যাল মোড় থেকে মিরপুর সড়ক ও বেগম রোকেয়া সরণির সঙ্গে সংযোগকারী অধ্যক্ষ আবুল কাশেম সড়কের কয়েকটি জায়গায় আড়াআড়িভাবে সড়ক কাটা হয়েছে।
মিরপুর-১ ও আশপাশের এলাকায় পানিনিষ্কাশনের কাজের জন্যও বিভিন্ন স্থানে সড়ক কাটা হয়েছে বলে জানিয়েছে সিটি করপোরেশন। তবে কাটা অংশের পাশাপাশি আশপাশের সড়কেও পানি জমে তৈরি হয়েছে গর্ত।
মিরপুরের একটি সড়ক ছয় মাসেরও বেশি আগে কাটা হলেও এখনো পুরোপুরি মেরামত করা হয়নি বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
অভ্যন্তরীণ সড়কেও একই অবস্থা
শুধু প্রধান সড়ক নয়, রাজধানীর অলিগলিতেও রয়েছে একই দুর্ভোগ। রায়েরবাজার, খিলক্ষেত, মোহাম্মদপুর, ছোলমাইদ, নুরেরচালা, পল্লবীসহ বিভিন্ন এলাকার অভ্যন্তরীণ সড়কে গর্ত, ভাঙন ও পানি জমে থাকার চিত্র দেখা গেছে।
মোহাম্মদপুরের লালমাটিয়ার বিভিন্ন ব্লকের সড়কেও পিচ উঠে গর্ত তৈরি হয়েছে। কোথাও স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেদের উদ্যোগে ইট-কংক্রিট দিয়ে গর্ত ভরাট করলেও কিছুদিন পর আবার নতুন করে ভাঙন দেখা দিয়েছে।
দক্ষিণ সিটির সড়কেও দুর্ভোগ
ঢাকা দক্ষিণ সিটির বিভিন্ন এলাকাতেও দেখা গেছে ভাঙাচোরা সড়ক ও দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার না হওয়া অংশ।
অতীশ দীপঙ্কর সড়কের একটি অংশ প্রায় ছয় মাস আগে কাটা হলেও সেখানে এখনো পুরোপুরি কার্পেটিং হয়নি। কাটা অংশ উঁচু-নিচু হয়ে যাওয়ায় যানবাহন চলাচলে সমস্যা হচ্ছে।
এক বাসচালক বলেন, রাস্তার অবস্থা দেখে মনে হয় বড় বড় পাথর ফেলে রাখা হয়েছে। এতে যানবাহন ধীরগতিতে চলছে এবং যাত্রীদেরও দুর্ভোগ হচ্ছে।
ডিএসসিসির প্রকৌশল বিভাগের দাবি, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে কর্তৃপক্ষ অনুমতি ছাড়াই ওই সড়কের অংশবিশেষ কেটেছিল। পরে সমঝোতা হলেও বর্ষাকালে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার কারণে কাজ এগিয়ে নেওয়া কঠিন হয়েছে।
সংস্কারকাজ চলছে, শেষ হচ্ছে না
সবুজবাগের বাসাবো থেকে মাদারটেক ও নন্দীপাড়া পর্যন্ত প্রায় আড়াই কিলোমিটার সড়কে সংস্কারকাজ চলছে। পানিনিষ্কাশন নালার কাজ শেষ হলেও সড়ক সংস্কারের কাজ এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দা ও যানবাহনচালকদের দীর্ঘদিন ধরে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা জানিয়েছেন, ঠিকাদারকে কাজ শেষ করার জন্য আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া বাসাবো বৌদ্ধমন্দির সড়ক, মালিবাগ, খিলগাঁওসহ বিভিন্ন এলাকার সড়কেও গর্ত ও ভাঙন রয়েছে। কিছু সড়ক সংস্কারের জন্য নতুন প্রকল্প নেওয়ার কথা জানিয়েছে সিটি করপোরেশন।
প্রতিবছর শত শত কোটি টাকা ব্যয়
দুই সিটি করপোরেশন প্রতিবছর সড়ক, নালা ও ফুটপাত নির্মাণ ও সংস্কারে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে। তারপরও বর্ষা এলেই অনেক সড়কে দেখা দিচ্ছে নতুন করে গর্ত ও ভাঙন।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতায় প্রায় ১ হাজার ৫৬০ কিলোমিটার সড়ক রয়েছে। চলতি অর্থবছরে পুরোনো ও নতুন ওয়ার্ড মিলিয়ে কয়েক শ কিলোমিটার সড়ক সংস্কার বা নির্মাণের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে ডিএনসিসি সড়ক, নালা ও ফুটপাত উন্নয়নে কয়েক শ কোটি টাকা ব্যয় করেছে। চলতি অর্থবছরেও এসব খাতে বড় অঙ্কের বরাদ্দ রয়েছে।
ডিএনসিসির প্রকৌশল বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, বর্ষায় বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে সড়কে গর্ত ও ফাটল তৈরি হয়। ক্ষতিগ্রস্ত অংশ নিয়মিত মেরামত করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনেরও প্রায় ১ হাজার ৫৫৬ কিলোমিটার সড়ক রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১২০ কিলোমিটার সড়ক সংস্কার বা পুনর্নির্মাণের প্রয়োজন। চলতি অর্থবছরেও সড়ক, নালা ও ফুটপাত উন্নয়নে কয়েক শ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
ডিএসসিসির প্রধান প্রকৌশলীর ভাষ্য, অতিবৃষ্টি ও দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকার কারণে অনেক সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পর্যায়ক্রমে সেসব সড়ক সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে প্রয়োজনের তুলনায় বরাদ্দ কম থাকায় একসঙ্গে সব সড়ক মেরামত করা সম্ভব হচ্ছে না।
প্রতিবছর বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও সড়ক নির্মাণের মান, পরিকল্পনার সমন্বয় এবং সংস্কারকাজের দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। ফলে শুধু নতুন করে রাস্তা মেরামত নয়, টেকসই পরিকল্পনা ও বিভিন্ন সংস্থার কাজের মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করাই এখন ঢাকার সড়ক দুর্ভোগ কমানোর বড় চ্যালেঞ্জ।
