ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরুর ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও উত্তেজনা কমেনি। বরং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। প্রণালিটি কার্যত বন্ধ রেখেছে ইরান, আর পাল্টা চাপ হিসেবে দেশটির বন্দরগুলো ঘিরে অবরোধ চালিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।
রোববার হরমুজ প্রণালির কাছে ইরানের লারাক দ্বীপে হামলা চালায় মার্কিন বাহিনী। ওয়াশিংটনের দাবি, প্রণালিতে মাইন পেতে রাখার সক্ষমতা ঠেকাতেই দ্বীপটির রকেট উৎক্ষেপণব্যবস্থায় হামলা চালানো হয়েছে।
এর জবাবে জর্ডান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরান। তেহরানের ভাষ্য, এসব হামলার লক্ষ্য ছিল সেখানে থাকা মার্কিন বাহিনী।
ফক্স নিউজের এক প্রতিবেদকের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত আলাপে ট্রাম্প বলেন, ইরানকে কঠোর জবাব দেওয়া হবে।
তবে একই সময়ে উত্তেজনা কমানোর বার্তা দিয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। কিরগিজস্তানে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে তিনি বলেন, ইরান যুদ্ধ চায় না। বরং সমঝোতা ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান খুঁজছে তেহরান।
পেজেশকিয়ানের মতে, যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া ইরান বা পুরো অঞ্চলের কারও স্বার্থে নয়। বর্তমান সংকট কাটাতে সংলাপ ও সহযোগিতার বিকল্প নেই।
ক্ষেপণাস্ত্র-ড্রোনে পাল্টাপাল্টি হামলা
লারাক দ্বীপে মার্কিন হামলায় তিনজন নিহত এবং আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম।
এদিকে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি দাবি করেছে, জর্ডানে থাকা দুটি মার্কিন বিমানঘাঁটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে এবং এতে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
তবে ট্রাম্পের দাবি, মার্কিন বাহিনীকে লক্ষ্য করে ছোড়া প্রায় সব ক্ষেপণাস্ত্রই ভূপাতিত করা হয়েছে। একটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা না গেলেও সেটি কোনো হুমকি তৈরি করেনি বলে জানান তিনি।
জর্ডানের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, দেশটির আকাশসীমায় প্রবেশ করা আটটি ক্ষেপণাস্ত্র আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে ধ্বংস করা হয়েছে।
অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি বিমানঘাঁটিতে থাকা মার্কিন সেনাদের লক্ষ্য করেও হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরান। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিতে একটি মার্কিন ড্রোন ভূপাতিত করার দাবিও করেছে তেহরান।
আবুধাবি জানিয়েছে, তাদের জলসীমায় একটি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে। তবে আল মিনহাদ বিমানঘাঁটিতে হামলার দাবি ‘ভিত্তিহীন’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে দেশটি।
তেলের বাজারে নতুন চাপ
হরমুজ প্রণালিতে ইরানের অবরোধের কারণে ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। তেলসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রেও জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য বাড়ার চাপ তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে হরমুজ প্রণালি থেকে বেরিয়ে আসার সময় ওমানের উত্তর-পূর্ব উপকূলের কাছে একটি তেলবাহী ট্যাংকারে তিনটি অজ্ঞাত বস্তু আঘাত করেছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস। তবে এতে কেউ হতাহত হয়নি এবং পরিবেশের ওপরও কোনো ক্ষতিকর প্রভাব পড়েনি।
অর্থনৈতিক চাপও বাড়াচ্ছে ওয়াশিংটন
সামরিক হামলার পাশাপাশি ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপও আরও বাড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানকে একটি ‘ব্যর্থ রাষ্ট্র’ হিসেবে উল্লেখ করে দাবি করেছেন, দেশটির সামরিক সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং অর্থনীতিও সংকটের মধ্যে রয়েছে।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টও ইরানের ওপর চাপ অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, এই চাপের ফলে কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাসের মধ্যে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।
হরমুজ নিয়েই মূল সংঘাত
গত ছয় মাসের সংঘাতের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ দিয়ে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যের বড় একটি অংশ পরিচালিত হয়। ফলে প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ায় এর প্রভাব পড়ছে বিশ্ববাজারে।
ট্রাম্প দাবি করেছেন, হরমুজ প্রণালির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। গত সপ্তাহে ওয়াশিংটন জানিয়েছিল, তারা প্রণালি থেকে মাইন সরানোর কাজ শেষ করেছে।
তবে ইরান পাল্টা দাবি করছে, প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এখনো তাদের হাতেই রয়েছে। আইআরজিসির অভিযোগ, একটি তেলবাহী ট্যাংকার অবৈধ পথে প্রণালি পার হওয়ার সময় মাইনের বিস্ফোরণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যদিও মার্কিন সামরিক বাহিনী এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে এটিকে অপপ্রচার বলে আখ্যা দিয়েছে।
আবারও সংলাপের আহ্বান
চলমান সংঘাতের মধ্যে কয়েক মাস ধরে যুদ্ধ বন্ধে মধ্যস্থতার চেষ্টা চালানো হলেও এখন পর্যন্ত স্থায়ী সমাধান হয়নি।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, সংকট সমাধানের পথ এখনও পরিষ্কার। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রকে আগের প্রতিশ্রুতিতে ফিরে আসতে হবে।
এদিকে পেজেশকিয়ানের সংলাপের আহ্বান এবং ট্রাম্পের কঠোর অবস্থান—দুই বিপরীত বার্তার মধ্যেই নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত এবার কি আরও বড় আকার নেবে, নাকি কূটনীতির মাধ্যমে উত্তেজনা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
