দীর্ঘদিন ধরে পানির সংকট চললেও এখনো এর কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি বলে অভিযোগ বাসিন্দাদের। তাদের দাবি, পানি সরবরাহ বন্ধ হওয়ার পর থেকে প্রতিদিন দূর-দূরান্তে গিয়ে পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। কখনো পানি কিনে ব্যবহার করতে হচ্ছে, আবার কখনো পাশের এলাকার মানুষের কাছ থেকে এক-দুই বালতি পানি নিয়ে কোনোভাবে দিন পার করছেন তারা।
কলোনির বাসিন্দাদের অভিযোগ, বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই তাদের এলাকায় পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। স্থানীয় বিজেপি বিধায়ক রীতেশ তিওয়ারির নির্দেশেই পানি সরবরাহ বন্ধ করা হয়েছে বলেও দাবি তাদের। বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন, বিধায়ক নাকি বলেছেন—এই কলোনির মানুষ তাকে ভোট দেয়নি, তাই তাদের জন্য তিনি কিছু করবেন না। তবে বিধায়ক এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
পানির সংকট নিয়ে কলকাতা হাইকোর্টে রিট পিটিশনও করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। পাশাপাশি উচ্ছেদের আশঙ্কায় সিটি সিভিল কোর্টেও সুরক্ষা চাওয়া হয়েছে। কিন্তু এখনো তারা কাঙ্ক্ষিত প্রতিকার পাননি বলে অভিযোগ।
দ্য ওয়্যারের প্রতিবেদক সরেজমিনে কলোনিতে গিয়ে দেখেছেন, বাড়ির সামনে রাখা পানির পাত্রগুলো শুকনো পড়ে আছে। কয়েকজন কিশোরী খালি পানির পাত্র নিয়ে ভ্যানের পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রতিদিন প্রায় দেড় কিলোমিটার পথ হেঁটে তাদের পানি সংগ্রহ করতে হয়। কখনো টাকা দিয়ে পানি কিনতে হয়, আবার কখনো পাশের হিন্দু বস্তি থেকে এক-দুই বালতি পানি পাওয়া যায়।
তবে পাশের এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যেও এক ধরনের আতঙ্ক তৈরি হয়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের। তাদের আশঙ্কা, মুসলিম প্রতিবেশীদের পানি দিলে তাদের এলাকাতেও পানি সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে।
কলোনির বাসিন্দা আকবর আলী বলেন, ‘পানি কেন বন্ধ? কারণ আমরা মুসলমান।’ তিনি জানান, পানি সরবরাহ চালুর জন্য বহুবার বোরো অফিস ও থানায় যোগাযোগ করা হলেও কোনো সমাধান হয়নি।
রশমিলা খাতুনের অভিযোগ, পানির অভাবে মানুষ বাধ্য হয়ে গঙ্গার পানি ব্যবহার করছে। সেই পানি দিয়ে গোসল করায় অনেকের শরীরে চর্মরোগ দেখা দিচ্ছে। শিশুদেরও নানা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। তার ভাষ্য, শিশুদের স্কুলে পাঠানো কঠিন হয়ে পড়েছে। বৃদ্ধ ও অসুস্থ মানুষ সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে রয়েছেন।
তিনি বলেন, এখন রান্না ও অন্যান্য প্রয়োজনেও নদীর পানি ব্যবহার করতে হচ্ছে। সেই পানির মধ্যে ময়লা রয়েছে। এমনকি ছয়-সাত মাস বয়সী শিশুদেরও ওই পানি দিয়ে গোসল করানো হচ্ছে। ফলে তাদের শরীরে র্যাশসহ বিভিন্ন ধরনের সমস্যা দেখা দিচ্ছে।
আরেক বাসিন্দা রিক্তা বিবি জানান, কয়েকদিন আগে কলোনির এক বাসিন্দা মারা যান। দাফনের আগে মৃতদেহ গোসল করানোর জন্যও পর্যাপ্ত পানি পাওয়া যায়নি। শেষ পর্যন্ত নদীর নোংরা পানি দিয়েই মৃতদেহ গোসল করাতে হয়েছে বলে জানান তিনি।
স্থানীয়দের দাবি, আগে এই এলাকায় পানি সরবরাহ স্বাভাবিক ছিল। পানি নিয়ে কোনো বড় ধরনের অভিযোগও ছিল না। তবে জুলাইয়ের শেষদিকে কলকাতা পুরসভা এলাকায় পাইপলাইনের কাজ করার পর পরিস্থিতি বদলে যায়।
বাসিন্দা মহিনুদ্দীন শেখ বলেন, কলোনির শুরুতে ও শেষ প্রান্তে দুটি গর্ত খোঁড়া হয়েছিল। তার দাবি, ২৮ জুলাই রাত প্রায় ১১টার দিকে পানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর আর পানি সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, যে অংশে পানি সরবরাহ বন্ধ রয়েছে, তার ঠিক আগে ও পরে থাকা এলাকায় নিয়মিত পানি পাওয়া যাচ্ছে। তাদের দাবি, ওই এলাকাগুলোর অধিকাংশ বাসিন্দা হিন্দু। ফলে একই এলাকার একাংশে পানি থাকলেও মুসলিম অধ্যুষিত জ্যোতিনগর কলোনিতে কেন পানি নেই, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন তারা।
কলোনিতে দীর্ঘদিন ধরে বসবাসকারী হিন্দু বাসিন্দা সরস্বতী বিশ্বাসও পানির সংকট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, দুই-তিন বছরের ছোট শিশুরাও পানি সংগ্রহ করতে নদীর ধারে যাচ্ছে। কয়েকদিন আগে একটি শিশু প্রায় পানিতে ডুবে যাচ্ছিল বলেও জানান তিনি।
সরস্বতী বিশ্বাস আরও অভিযোগ করেন, নতুন বিধায়ক স্থানীয় বাসিন্দাদের ‘বাংলাদেশি’ ও ‘অবৈধ দখলদার’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তবে নিজের নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, তিনি কীভাবে বাংলাদেশি হবেন? তার পূর্বপুরুষরা এই এলাকায় বসবাস করেছেন এবং তার প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও রয়েছে। এমনকি এবারও তিনি ভোট দিয়েছেন বলে জানান।
স্থানীয় বাসিন্দাদের আশঙ্কা, পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে তাদের এলাকা থেকে উচ্ছেদ করার একটি পরিকল্পনা চলছে। কলোনির সাধারণ সম্পাদক আলমগীর বিশ্বাস বলেন, মৌলিক নাগরিক সুবিধা বন্ধ করে দিয়ে মানুষকে এলাকা ছাড়তে বাধ্য করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
একই অভিযোগ করেছেন মর্জিনা বেগমও। তার দাবি, দীর্ঘদিন পানি ও অন্যান্য মৌলিক সুবিধা না থাকায় এখানকার মানুষের জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছে।
কয়েকজন নারী স্থানীয় বিধায়কের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন বলেও জানান বাসিন্দারা। তাদের অভিযোগ, সেখানে তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হয় এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে এমন মন্তব্যও করা হয়েছে।
এক বয়স্ক নারী অভিযোগ করেন, বিধায়ক তাদের সঙ্গে তুই-তোকারি করে কথা বলেছেন এবং মসজিদ নির্মাণ ও ধর্মীয় প্রার্থনা নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করেছেন। তার দাবি, বিধায়ক তাদের চলে যেতে বলেছেন এবং পানি বন্ধের বিষয়ে কোনো সহযোগিতা করবেন না বলে জানিয়েছেন।
স্বাতী বিবির অভিযোগ, বিধায়ক বলেছেন—এই জমি কলকাতা পোর্ট ট্রাস্টের। তার দাবি, বাসিন্দারা ওই জমি জবরদখল করে বসবাস করছেন। এ কারণেই পানি এবং এর আগে বিদ্যুৎ সরবরাহও বন্ধ করা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি।
পানির সংকট ও উচ্ছেদের আশঙ্কা নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন। তারা কলকাতা হাইকোর্টে রিট করার পাশাপাশি সিটি সিভিল কোর্টেও উচ্ছেদ থেকে সুরক্ষা চেয়েছিলেন। তবে গত ১৮ আগস্ট আদালত তাদের কোনো সুরক্ষা দেয়নি বলে জানান বাসিন্দারা।
বাসিন্দা বাবু গাজী প্রশ্ন করেন, তাদের বস্তি যদি দীর্ঘদিন ধরে নিবন্ধিত হয়ে থাকে, তাহলে হঠাৎ করে কীভাবে সেটিকে পোর্ট ট্রাস্টের জমি বলা হচ্ছে? তার দাবি, প্রায় ৭০ বছর ধরে তারা এখানে বসবাস করছেন। এতদিন কেউ তাদের জবরদখলকারী বলে দাবি করেনি।
এদিকে স্থানীয় বিজেপি বিধায়ক রীতেশ তিওয়ারির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তার বক্তব্য, জমিটি বন্দর কর্তৃপক্ষের এবং জমির মালিকানা নিয়ে মানুষের সঙ্গে বন্দরের বিরোধ রয়েছে।
তিনি বলেন, হাইকোর্ট সাময়িকভাবে জোরজুলুম না করার নির্দেশ দিয়েছেন। পানি সরবরাহের বিষয়ে নিজের ভূমিকা প্রসঙ্গে বিধায়ক বলেন, পানি সরবরাহ করে কলকাতা মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন বা কেএমসি। ফলে পানি সরবরাহ চালু করার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা কী—এমন প্রশ্নও তোলেন তিনি।
পানি সরবরাহ চালু করতে তিনি কোনো সহযোগিতা করতে পারবেন কি না জানতে চাইলে রীতেশ তিওয়ারি বলেন, এটি তার কাজ নয়। এ বিষয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা অন্য নেতাদের কাছে গেছেন এবং তাদের ওপরই আস্থা রাখা উচিত।
পানি সংকটের বিষয়ে কলকাতা মিউনিসিপ্যাল কমিশনার ও পোর্ট ট্রাস্ট কর্তৃপক্ষের কাছেও মন্তব্য চাওয়া হয়েছিল। তবে প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত তাদের কাছ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে একটি এলাকার হাজার হাজার মানুষ খাবার পানির মতো মৌলিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত রয়েছেন। সুপ্রিম কোর্টসহ বিভিন্ন হাইকোর্টের বিভিন্ন রায়ে পানি মানুষের মৌলিক অধিকারের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে জ্যোতিনগর কলোনির বাসিন্দাদের দীর্ঘদিন ধরে পানিহীন অবস্থায় বসবাসের বিষয়টি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
বাসিন্দাদের দাবি, ধর্ম, রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা জমি নিয়ে বিরোধ—যে কারণই থাকুক না কেন, সাধারণ মানুষকে খাবার পানি থেকে বঞ্চিত রাখা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তাই দ্রুত পানি সরবরাহ পুনরায় চালু করে সমস্যার স্থায়ী সমাধানের দাবি জানিয়েছেন তারা।
