হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। কমিটিকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
এদিকে অগ্নিকাণ্ডের পর পদদলিত হয়ে ছয়জনের মৃত্যুর খবর নিয়ে ধূম্রজাল সৃষ্টি হয়েছে। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আগুন লাগার পর আতঙ্কে বের হতে গিয়ে পদদলিত হয়ে ছয়জন মারা গেছেন—এমন খবর সঠিক নয় বলে জানিয়েছেন বিভাগীয় কমিশনার এস এম হুমায়ুন কবির সরকার। সোমবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে হাসপাতাল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের তিনি এ তথ্য জানান।
তবে এর আগে ময়মনসিংহ জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অর্থ ও প্রশাসন) মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, আতঙ্কের মধ্যে একটি মাত্র সিঁড়ি দিয়ে তাড়াহুড়া করে বের হতে গিয়ে পদদলিত হয়ে শিশুসহ ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে।
এর মধ্যেই গতকাল মঙ্গলবার সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অগ্নিকাণ্ডের সময় হাসপাতালের নতুন ভবনের পাঁচটি সিঁড়ির মধ্যে চারটিতেই তালা লাগানো ছিল। সোমবার বিকালে অগ্নিকাণ্ডের পর রোগী ও তাদের স্বজনেরা নিচে নামার চেষ্টা করলেও তালাবদ্ধ থাকায় ওই চারটি সিঁড়ি ব্যবহার করতে পারেননি। ফলে আতঙ্কিত রোগী ও স্বজনেরা একটি মাত্র সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামার চেষ্টা করেন। এতে ভোগান্তি ও হতাহতের ঘটনা বেড়েছে বলে অভিযোগ করেছেন রোগীদের স্বজনেরা।
বিভাগীয় কমিশনার যা বললেন
অগ্নিকাণ্ডের পর প্রেস ব্রিফিংয়ে বিভাগীয় কমিশনার এস এম হুমায়ুন কবির সরকার বলেন, হাসপাতালে পদদলিত হয়ে কেউ মারা গেছেন—এমন কোনো প্রমাণ তিনি এখনো পাননি। এ ধরনের কোনো প্রমাণ পাওয়া গেলে তা যাচাই করে দেখা হবে।
তিনি জানান, এখন পর্যন্ত এ ঘটনায় চারজনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। তবে তালিকায় থাকা মৃতদের মধ্যে একজন এখনো জীবিত এবং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। বাকি চারজনের মধ্যে দুজন স্বাভাবিকভাবে মারা গেছেন বলে তাদের পরিবারের সদস্যরা নিশ্চিত করেছেন। অন্য দুজনের মৃত্যুর কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তদন্ত শেষ হলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে।
সিঁড়ি তালাবদ্ধ থাকায় ক্ষোভ
অগ্নিকাণ্ডের সময় পদদলিত হয়ে মারা গেছেন বলে পরিবারের দাবি করা একজনের স্বজনের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। নিহত রমজান আলীর ছোট ভাই সাইফুল ইসলাম বলেন, তার ভাই আগে থেকেই হৃদরোগে ভুগছিলেন। একটি সিঁড়ি দিয়ে সবাই হুড়োহুড়ি করে চারতলা থেকে নিচে নামার সময় ধাক্কাধাক্কির মধ্যে পড়ে গিয়ে সেখানেই তার ভাইয়ের মৃত্যু হয়।
সাইফুল ইসলামের অভিযোগ, হাসপাতালের পাঁচটি সিঁড়ির মধ্যে চারটিই বন্ধ ছিল। একই সঙ্গে লিফটও কার্যকর ছিল না। সব সিঁড়ি চালু থাকলে রোগী ও স্বজনেরা সহজে নিচে নামতে পারতেন এবং এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো না বলে মনে করেন তিনি।
তার ভাষায়, ‘হাসপাতালের পাঁচটা সিঁড়ির মধ্যে চারটাই বন্ধ ছিল। লিফটও কার্যকর ছিল না। সিঁড়িগুলো চালু থাকলে এমন অবস্থা হতো না। এ জন্য আমরা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকেই দায়ী মনে করি।’
অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মারা গেছেন ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলার বালিখা গ্রামের শহীদুল ইসলামের স্ত্রী কুলসুমা (৩৫)। কুলসুমার ননদ নাজমা আক্তার জানান, তার ১২ বছর বয়সী ভাতিজা স্বাধীন হাসপাতালের নতুন ভবনের ষষ্ঠ তলায় ভর্তি ছিল।
সোমবার সন্ধ্যার দিকে হঠাৎ আগুন দেখা দেওয়ার পর প্রচণ্ড ধোঁয়া ষষ্ঠ তলায় প্রবেশ করে। এতে হাসপাতালের রোগী ও তাদের স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সবাই হুড়োহুড়ি করে একটি সিঁড়ি দিয়ে দ্রুত নিচে নামার চেষ্টা করতে থাকেন।
এ সময় কুলসুমাও তার ছেলে স্বাধীন ও মেয়ে মীমকে সঙ্গে নিয়ে নিচে নামছিলেন। ষষ্ঠ তলা থেকে চারতলা পর্যন্ত আসার পর হঠাৎ তিনি পড়ে যান। এতে তার পেট, পিঠসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর আঘাত লাগে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। সেখানে নেওয়ার প্রায় এক ঘণ্টার মধ্যেই কুলসুমার মৃত্যু হয়।
গতকাল সকাল ১০টায় বালিখা গ্রামে জানাজা শেষে কুলসুমার মরদেহ তার নিজ বাড়ির আঙিনায় দাফন করা হয়েছে।
অন্যদিকে নিহত শাহাজাহান মনির ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার রাঙ্গামাটিয়া ইউনিয়নের বিষ্ণুরামপুর গ্রামের নাজিমুল্লাহর ছেলে। পেশায় পল্লিচিকিৎসক শাহাজাহান মনির ১০ থেকে ১২ দিন ধরে হাসপাতালের নতুন ভবনে যক্ষ্মার চিকিৎসা নিচ্ছিলেন।
স্বজনদের দাবি, সোমবার সন্ধ্যায় হাসপাতালের লিফটে আগুন লাগার পর স্ত্রী ও স্ত্রীর বড় বোনের সঙ্গে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামার সময় পদদলিত হয়ে শাহাজাহান মনিরের মৃত্যু হয়।
পরদিন বেলা ১১টায় বাড়ির আঙিনায় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে শাহাজাহান মনিরের মরদেহ দাফন করা হয়।
ঘটনার সময় শাহাজাহান মনিরের সঙ্গে ছিলেন তার স্ত্রী হারিসা বেগম। তিনি বলেন, ‘রোগীরে নিয়া এক সিঁড়ির দুই-তিন ধাপ নামার পরেই পইড়া গেছি। পরে আমি অজ্ঞান হইয়া যাই। যহন হুঁশ হইছে, তহন দেহি মাইনষে কান্দাকাটি করতাছে। মানুষের পাড়ায় পিষ্ট হইয়া আমার মানুষটা মারা গেছে।’
সিঁড়ি কেন বন্ধ ছিল
হাসপাতালের পাঁচটি সিঁড়ির মধ্যে চারটি কেন বন্ধ ছিল—এ বিষয়ে জানতে চাইলে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান বলেন, নিরাপত্তার কারণে চারটি সিঁড়ি বন্ধ রাখা হয়েছিল।
তবে অগ্নিকাণ্ডের পর পরিস্থিতি বিবেচনায় বন্ধ থাকা চারটি সিঁড়ি খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
তিনি জানান, হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক গোলাম রহমান ভূঁইয়াকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। অগ্নিকাণ্ডের সময় সিঁড়ি বন্ধ থাকা, রোগী ও স্বজনদের চলাচল, হতাহতের ঘটনা এবং অন্যান্য বিষয় তদন্ত কমিটি খতিয়ে দেখবে।
লিফটের ক্যাবল বেয়ে আগুন ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা
অগ্নিকাণ্ডের কারণ সম্পর্কে ফায়ার সার্ভিসের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে ময়মনসিংহ ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক পূর্ণ চন্দ্র মুত্সুদ্দী বলেন, লিফটের কন্ট্রোল বোর্ড ও বিদ্যুৎ সরবরাহের অংশে আগুন লাগার চিহ্ন পাওয়া গেছে।
অতিরিক্ত তাপের কারণে ওই স্থান থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। লিফটের ক্যাবলের মধ্যে আগুন লেগে তা ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং এর মাধ্যমে আগুনের বিস্তার ঘটেছে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।
ফায়ার সার্ভিসের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, হাসপাতালের সব সিঁড়ি খোলা থাকলে রোগী ও তাদের স্বজনেরা সহজেই নিচে নেমে যেতে পারতেন। এতে আতঙ্ক ও ভিড়ের পরিস্থিতিও তুলনামূলকভাবে কম হতে পারত।
এদিকে অগ্নিকাণ্ডের পর হাসপাতাল পরিদর্শন করেছেন প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। তাদের মধ্যে ছিলেন সংসদ সদস্য আবু ওয়াহাব আকন্দ, রেঞ্জ ডিআইজি মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান, ময়মনসিংহ সিটি প্রশাসক রুকনোজ্জামান এবং ময়মনসিংহ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মোতাহার হোসেন তালুকদারসহ প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা।
অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ, হাসপাতালের নিরাপত্তাব্যবস্থা, সিঁড়িগুলো বন্ধ থাকার কারণ এবং হতাহতের প্রকৃত পরিস্থিতি তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের পর আরও স্পষ্ট হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
