বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কঠোর অবস্থানের কারণে এসব নিয়ম মেনে চলায় শিক্ষার্থীরা আগের তুলনায় শ্রেণিপাঠে আরও বেশি মনোযোগী হয়েছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষক ও অভিভাবকরা। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে নিয়ম মেনে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাঠদানে মনোযোগ বাড়লেও অবকাঠামোগত সংকট রয়ে গেছে। পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ না থাকায় বিদ্যালয়ের কয়েকটি শ্রেণির পাঠদান করতে হচ্ছে খোলা আকাশের নিচে বটগাছের তলায়। এতে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যদের নানা ধরনের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
সাবোখালী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিপদ ভঞ্জন মণ্ডল জানান, সম্প্রতি চিতলমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খাদিজা আক্তার বিদ্যালয়ে আয়োজিত অভিভাবক সমাবেশে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ায় আরও মনোযোগী করার জন্য তিনটি বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেন।
ইউএনওর নির্দেশনা অনুযায়ী বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এখন বাড়ি থেকেই দুপুরের টিফিন নিয়ে আসছে। টিফিনের সময় কোনো শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ের সীমানার বাইরে গিয়ে দোকানের খাবার খাচ্ছে না। পাশাপাশি বিদ্যালয়ে মোবাইল ফোন ও মোটরসাইকেল নিয়ে আসাও বন্ধ রয়েছে।
প্রধান শিক্ষক বিপদ ভঞ্জন মণ্ডল বলেন, তিনটি নিয়ম কঠোরভাবে মেনে চলার কারণে অভিভাবকেরা খুবই খুশি। শিক্ষার্থীরাও আগের তুলনায় অনেক বেশি শ্রেণিপাঠে মনোযোগী হয়েছে। এতে তাদের মন ও শরীর ভালো থাকছে। পাশাপাশি বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়ার সময় মোটরসাইকেল ব্যবহারের কারণে সম্ভাব্য সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকিও কমছে।
তিনি বলেন, নিয়মগুলো চালু করার পর শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটি শৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে। টিফিনের সময় বিদ্যালয়ের বাইরে গিয়ে খাবার খাওয়ার প্রবণতাও নেই। মোবাইল ফোন ও মোটরসাইকেল না আনার কারণে শ্রেণিকক্ষে অপ্রয়োজনীয় ব্যস্ততা ও মনোযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার সুযোগও কমেছে।
তবে বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ সংকটের কথা উল্লেখ করে প্রধান শিক্ষক বলেন, উপযুক্ত শ্রেণিকক্ষ না থাকায় কয়েকটি শ্রেণির ক্লাস বটগাছের নিচে বসে করাতে হচ্ছে। বিষয়টি বিদ্যালয়ের জন্য অত্যন্ত দুঃখজনক। শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি ও পাঠে আগ্রহ থাকলেও পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষের অভাবে তাদের স্বাভাবিক পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যালয়ে একটি নতুন চারতলা ভবন নির্মাণ করা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে।
প্রধান শিক্ষক জানান, ১৯৬৭ সালে সাবোখালী মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে বিদ্যালয়ে ২২৪ জন শিক্ষার্থী নিয়মিত ক্লাসে আসে। শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি থাকলেও পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ না থাকায় তাদের পাঠদানের জন্য প্রয়োজনীয় জায়গা সংকট দেখা দিয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমাদের বিদ্যালয়ে সব শিক্ষার্থী নিয়মিত ক্লাসে আসে। শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নিয়ে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু তাদের পাঠদানের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা নেই। শ্রেণিকক্ষের সংকটের কারণে অনেক সময় বাধ্য হয়ে বটতলায় ক্লাস নিতে হচ্ছে।’
বিদ্যালয়ে নতুন ভবন নির্মাণের জন্য ইউএনওর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে লিখিত আবেদন করা হয়েছে বলেও জানান প্রধান শিক্ষক। তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী মৌসুমী বিশ্বাসসহ অন্য শিক্ষার্থীরা জানায়, বিদ্যালয়ে নতুন তিনটি নিয়ম চালু হওয়ার পর তাদের লেখাপড়ায় মনোযোগ বেড়েছে। বাড়ি থেকে টিফিন নিয়ে আসায় টিফিনের সময় বিদ্যালয়ের বাইরে যেতে হচ্ছে না। একই সঙ্গে মোবাইল ফোন ও মোটরসাইকেল না থাকায় ক্লাসে মনোযোগ ধরে রাখা সহজ হচ্ছে।
শিক্ষার্থীরা আরও জানায়, এসব নিয়মের কারণে তাদের মন ও শরীর ভালো থাকছে এবং সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি থেকেও অনেকটা রক্ষা পাওয়া যাচ্ছে। তবে বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত সমস্যাগুলো নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন।
তাদের অভিযোগ, বিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্থানের দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়ছে। ফ্লোর ও দেয়ালে ফাটলও দেখা দিয়েছে। বর্ষাকালে টিনের চাল দিয়ে পানি পড়ে শ্রেণিকক্ষে। এর ফলে বৃষ্টির সময় পাঠদান ব্যাহত হয়। পাশাপাশি বিদ্যালয়ের হোয়াইট বোর্ডও ভেঙে গেছে। নেই কোনো ডিজিটাল ক্লাসের ব্যবস্থা। পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ না থাকায় অনেক সময় তাদের বটগাছের নিচে বসেই ক্লাস করতে হয়।
বিদ্যালয়ের শিক্ষক মো. আব্দুস শাকুর বলেন, ‘শ্রেণিকক্ষের অভাবে অনেক ক্লাস খোলা আকাশের নিচে বটগাছের তলায় করাতে হচ্ছে। এতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অনেক কষ্ট হয়। রোদ-বৃষ্টি ও আবহাওয়ার নানা পরিস্থিতির মধ্যেও ক্লাস নিতে হচ্ছে। কিন্তু বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় কিছু করার নেই। বিদ্যালয়ের জন্য একটি নতুন ভবন খুবই প্রয়োজন।’
সাবোখালী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির (এসএমসি) সভাপতি লিমন বিশ্বাস ইউনুস বলেন, ‘১৯৬৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যালয়ে প্রায় ২৫০ শিক্ষার্থী রয়েছে। কিন্তু তাদের পাঠদানের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা নেই। শ্রেণিকক্ষ সংকটের কারণে শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। তাই অবিলম্বে বিদ্যালয়ে একটি নতুন চারতলা ভবন নির্মাণের দাবি জানাচ্ছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘কিছু মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কম হলেও চারতলা ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। অথচ আমাদের বিদ্যালয়ে প্রচুর শিক্ষার্থী থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় শ্রেণিকক্ষ নেই। ফলে শিক্ষার্থীদের কখনো কখনো বটতলায় ক্লাস করতে হচ্ছে। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।’
এদিকে বিদ্যালয়ের নিয়ম-শৃঙ্খলা ও অবকাঠামোগত সমস্যা নিয়ে চিতলমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খাদিজা আক্তার জানান, তিনি ইতিমধ্যে সাবোখালী মাধ্যমিক বিদ্যালয় পরিদর্শন করেছেন। পরিদর্শনের সময় বিদ্যালয়ের বিভিন্ন সমস্যা সম্পর্কে অবগত হয়েছেন।
তিনি বলেন, বিদ্যালয়ের সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানান তিনি।
