হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তাদের বরাতে জানা গেছে, আগামী বুধবার ওয়াশিংটনের বাইরে অবস্থিত জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে শি জিনপিংয়ের বিমান অবতরণ করবে। সেখানে প্রচলিত প্রথার ব্যতিক্রম ঘটিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই চীনা প্রেসিডেন্টকে স্বাগত জানাতে উপস্থিত থাকবেন। বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানদের সাধারণত এভাবে বিমানবন্দরে গিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টের স্বাগত জানানোর ঘটনা বিরল। শি জিনপিংয়ের সফরকে ঘিরে এমন বিশেষ আয়োজনের মধ্য দিয়েই এর আনুষ্ঠানিক সূচনা হবে।
সফরের মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে পরদিন বৃহস্পতিবার। ওই দিন হোয়াইট হাউসের স্টেট ফ্লোরে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও তার স্ত্রী পেং লিউয়েনকে স্বাগত জানাবেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প। এরপর রোজ গার্ডেনে সামরিক গার্ড অব অনার পরিদর্শন করবেন দুই নেতা। আনুষ্ঠানিকতা শেষে তারা দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বসবেন। একই সময়ে দুই দেশের ফার্স্ট লেডি পৃথক কর্মসূচিতে অংশ নেবেন।
সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন হিসেবে বৃহস্পতিবার রাতে হোয়াইট হাউসের ইস্ট রুমে চীনা প্রতিনিধিদলের সম্মানে রাষ্ট্রীয় নৈশভোজের আয়োজন করা হয়েছে। এই নৈশভোজে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ প্রযুক্তি ও ব্যবসায়ী ব্যক্তিত্বদের একটি অংশ আমন্ত্রিত থাকবেন। অতিথিদের তালিকায় রয়েছেন আমাজনের জেফ বেজোস, টেসলার ইলন মাস্ক, গুগলের সুন্দর পিচাই, ওপেনএআইয়ের স্যাম অল্টম্যান, এনভিডিয়ার জেনসেন হুয়াং, ডেল টেকনোলজিসের মাইকেল ডেল, সিটিগ্রুপের জেন ফ্রেজার এবং অ্যাপলের সদ্য সাবেক প্রধান নির্বাহী টিম কুক।
হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নির্মাণাধীন নতুন বলরুমের কাজ এখনও শেষ না হওয়ায় নৈশভোজে আমন্ত্রিত অতিথির সংখ্যা সীমিত রাখতে হয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসা, প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব থাকলেও সবাইকে আমন্ত্রণ জানানো সম্ভব হয়নি বলে জানা গেছে।
শুক্রবার সফরের শেষ দিনে শি জিনপিং ও পেং লিউয়েন হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প দম্পতির সঙ্গে একটি ব্যক্তিগত চা-চক্রে অংশ নেবেন। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম বার্ষিকী উদযাপনের অংশ হিসেবে তাদের নিয়ে ন্যাশনাল আর্কাইভস পরিদর্শনে যাওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস ও প্রতিষ্ঠাকালীন গুরুত্বপূর্ণ দলিল সংরক্ষিত রয়েছে। এই কর্মসূচি শেষে শি জিনপিং ওয়াশিংটন ত্যাগ করবেন।
রাষ্ট্রীয় সফরের পাশাপাশি দুই দেশের শীর্ষ অর্থনৈতিক কর্মকর্তারাও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় বসছেন। নিউইয়র্কে মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট চীনের ভাইস প্রিমিয়ার হি লিফেংয়ের সঙ্গে বৈঠক করবেন। এই আলোচনায় দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক, বাণিজ্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিরল মৃত্তিকা ধাতুর সরবরাহ নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
বিশেষ করে যুদ্ধবিমান ও স্মার্টফোনসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিপণ্য তৈরিতে ব্যবহৃত বিরল মৃত্তিকা ধাতুর সরবরাহ বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের অর্থনৈতিক আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। একই সঙ্গে কিছু অ-কৌশলগত পণ্যের ওপর পারস্পরিক শুল্ক কমানোর বিষয়েও আলোচনা হতে পারে। তবে বিরল মৃত্তিকা ধাতুর সরবরাহ নিশ্চিত করার বিনিময়ে ওয়াশিংটন তাদের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ উল্লেখযোগ্যভাবে শিথিল করবে কি না, সেটি এখনও আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে রয়েছে। এসব আলোচনায় মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ারও অংশ নেবেন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও ট্রাম্প-শি বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য হতে পারে। দুই দেশের প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা ও এআই খাতে নেতৃত্বের বিষয়টি বর্তমানে ওয়াশিংটন-বেইজিং সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। ফলে শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিদের রাষ্ট্রীয় নৈশভোজে উপস্থিতি এবং একই সময়ে দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ে এআই নিয়ে আলোচনা—দুটিই বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
এর আগে ডোনাল্ড ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে এবং চলতি বছরের মে মাসে চীন সফর করেছিলেন। মে মাসের সফরে বেইজিংয়ে চীনা কর্তৃপক্ষ তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানিয়েছিল। এবার তার পাল্টা আয়োজনে ওয়াশিংটনে শি জিনপিংকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় স্বাগত জানানো হচ্ছে।
অন্যদিকে, এক দশকের বেশি সময়ের মধ্যে এটি চীনের কোনো শীর্ষ নেতার প্রথম মার্কিন রাষ্ট্রীয় সফর। সর্বশেষ ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আমলে যুক্তরাষ্ট্র সফর করেছিলেন শি জিনপিং। ফলে দীর্ঘ বিরতির পর শি জিনপিংয়ের এই সফর দুই দেশের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
