অধিবেশনে বক্তব্য দেওয়া অনেক নেতা গাজার বর্তমান পরিস্থিতিকে যুদ্ধাপরাধ, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি ও গণহত্যার মতো গুরুতর অভিযোগের সঙ্গে তুলনা করেছেন। কেউ কেউ পরিস্থিতিকে কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের সঙ্গেও তুলনা করেছেন। তবে এসব বক্তব্য সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের নিজস্ব মূল্যায়ন ও রাজনৈতিক অবস্থান হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে।
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ৭ অক্টোবরের হামাসের হামলার নিন্দা জানান। একই সঙ্গে গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর চলমান ধ্বংসযজ্ঞেরও সমালোচনা করেন তিনি। পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ ও সহিংসতার কারণে জাতিগত নির্মূলের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে বলেও সতর্ক করেছেন গুতেরেস।
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান গাজার পরিস্থিতি তুলে ধরে অঞ্চলটিকে ‘শিশুদের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে বড় কবরস্থান’ এবং ‘কনসেনট্রেশন ক্যাম্প’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। কাতার ও জর্ডানের নেতারাও গাজার পরিস্থিতিকে গণহত্যা এবং ফিলিস্তিনিদের অস্তিত্ব মুছে ফেলার ষড়যন্ত্র হিসেবে উল্লেখ করেন।
কাতারের আমির অবিলম্বে ইসরায়েলি সামরিক অভিযান বন্ধ এবং গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের দাবি জানান। তার বক্তব্যে গাজায় চলমান মানবিক সংকটের অবসান এবং ফিলিস্তিনিদের জন্য জরুরি সহায়তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তাও উঠে আসে।
শুধু আরব বা মুসলিম দেশগুলোর নেতারাই নন, পশ্চিমা মিত্র দেশগুলোর কয়েকজন নেতাও ইসরায়েলের নীতির সমালোচনা করেছেন। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ গাজায় মানবিক করিডোর না খোলার বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের নীতি নিরাপত্তা বাড়ানোর পরিবর্তে উল্টো হুমকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীও ৭ অক্টোবরের হামলার নিন্দা জানান। তবে তিনি বলেন, ওই হামলা গাজা ও পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের চলমান কর্মকাণ্ডকে কোনোভাবেই বৈধতা দেয় না।
ব্রাজিল, সিরিয়াসহ আরও কয়েকটি দেশের নেতারাও জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ইসরায়েলি সরকারের কর্মকাণ্ডের কঠোর সমালোচনা করেন। তাদের বক্তব্যে গাজায় বেসামরিক মানুষের হতাহত, বাস্তুচ্যুতি এবং মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করার বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।
বক্তৃতার মঞ্চের বাইরেও গাজা পরিস্থিতি নিয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার হয়েছে। কাতার, মিশর ও জর্ডানসহ আরব ও মুসলিম বিশ্বের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা গাজার মানবিক সংকট নিয়ে জরুরি বৈঠকে বসেছেন। বৈঠকে গাজায় মানবিক সহায়তা পৌঁছানো, বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা এবং চলমান সংঘাতের অবসানের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
এর পাশাপাশি ব্রিটেন, ফ্রান্স ও কানাডাসহ ১২টি পশ্চিমা দেশ ইসরায়েলি বসতি এলাকা থেকে আসা পণ্যের ওপর বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপের পদক্ষেপ নিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে গাজা যুদ্ধ ও পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণের বিষয়ে আন্তর্জাতিক চাপ আরও দৃশ্যমান হয়েছে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের এবারের অধিবেশনে গাজা যুদ্ধ তাই অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে। একদিকে ৭ অক্টোবরের হামলার নিন্দা, অন্যদিকে গাজা ও পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি সামরিক অভিযান, বেসামরিক হতাহত এবং মানবিক সংকট নিয়ে বিশ্বনেতাদের বক্তব্যে তীব্র উদ্বেগ ও সমালোচনা উঠে এসেছে। এর ফলে গাজা ইস্যুতে ইসরায়েলের ওপর আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপ আরও বাড়ার বিষয়টি অধিবেশনের আলোচনায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
