জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ভাষণ দিতে যাচ্ছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এর মধ্য দিয়ে পিতা ও মাতার পর একই পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে জাতিসংঘের মঞ্চে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন তিনি। ফলে আন্তর্জাতিক কূটনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই মঞ্চে জিয়া পরিবারের তিন প্রজন্মের প্রতিনিধিত্বের একটি নজির তৈরি হচ্ছে।
জাতিসংঘের সরকারি নথি অনুযায়ী, ১৯৮০ সালের ২৬ আগস্ট সাধারণ পরিষদের একাদশ বিশেষ অধিবেশনে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে ভাষণ দিয়েছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। এরপর তার স্ত্রী খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের একাধিক অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। এবার তাঁদের সন্তান তারেক রহমান দেশের সরকারপ্রধান হিসেবে প্রথমবারের মতো সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ভাষণ দিতে যাচ্ছেন।
স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে জাতিসংঘের মঞ্চে প্রথম ভাষণ দিয়েছিলেন জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৭৪ সালে তিনি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। পরবর্তীতে তার কন্যা শেখ হাসিনাও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে একাধিকবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেছেন।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও রাজনৈতিক পরিবারের একাধিক প্রজন্মকে জাতিসংঘের মঞ্চে দেখা গেছে। এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও আমেরিকার বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিবারে এমন নজির রয়েছে।
ভারতের নেহরু-গান্ধী পরিবারের তিন সদস্য জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বক্তব্য দিয়েছেন। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু ১৯৪৮ ও ১৯৬০ সালে জাতিসংঘে ভাষণ দেন। পরবর্তীতে তার কন্যা ইন্দিরা গান্ধী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ১৯৬৮ ও ১৯৮৫ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বক্তব্য রাখেন। ইন্দিরা গান্ধীর ছেলে রাজীব গান্ধীও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ১৯৮৫ ও ১৯৮৮ সালে সাধারণ পরিষদে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেন।
শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রেও দেখা যায় একই ধরনের রাজনৈতিক পারিবারিক উত্তরাধিকার। দেশটির প্রধানমন্ত্রী এস ডব্লিউ আর ডি বন্দরনায়েকে ১৯৫৬ সালে জাতিসংঘে ভাষণ দেন। তার স্ত্রী সিরিমাভো বন্দরনায়েকে, যিনি বিশ্বের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছেন, ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকে একাধিকবার সাধারণ পরিষদে বক্তব্য রাখেন। পরবর্তীতে তাঁদের কন্যা চন্দ্রিকা বন্দরনায়েকে কুমারাতুঙ্গাও দেশটির রাষ্ট্রপতি হিসেবে ১৯৯০ ও ২০০০-এর দশকে জাতিসংঘের মঞ্চে ভাষণ দেন।
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতেও বুশ পরিবারের পিতা ও পুত্র উভয়ের জাতিসংঘে ভাষণ দেওয়ার নজির রয়েছে। দেশটির ৪১তম প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ ১৯৮৯ থেকে ১৯৯২ সালের মধ্যে জাতিসংঘে একাধিকবার বক্তব্য দেন। তার ছেলে ৪৩তম প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশও ২০০১ থেকে ২০০৮ সালের মধ্যে নিয়মিত জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করেন।
পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিবারগুলোর মধ্যেও এমন নজির রয়েছে। জুলফিকার আলী ভুট্টো ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাতিসংঘে বক্তব্য রাখেন। পরবর্তীতে তার কন্যা বেনজীর ভুট্টো প্রথম মুসলিম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ১৯৮৯ ও ১৯৯৬ সালে সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ভাষণ দেন।
ইন্দোনেশিয়ার ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক পরিবারের প্রজন্মভিত্তিক উপস্থিতি দেখা যায়। দেশটির প্রথম প্রেসিডেন্ট আহমদ সুকর্ন ১৯৬০ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ১৫তম অধিবেশনে ভাষণ দেন। ওই ভাষণ পরবর্তীতে ইউনেস্কোর ‘মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ স্বীকৃতি পায়। তার কন্যা মেঘবতী সুকর্নপুত্রি দেশটির পঞ্চম রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে ২০০১ থেকে ২০০৪ মেয়াদে সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেন এবং বাবার রাজনৈতিক উত্তরসূরি হিসেবে আন্তর্জাতিক মঞ্চে দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন।
এ ছাড়া ইন্দোনেশিয়ার সুমিত্রো জোযোহাদিকুসুমো ও তার ছেলে প্রাবোও সুবিয়ান্তো, থাইল্যান্ডের থাকসিন শিনাওয়াত্রা ও তার বোন ইংলাক শিনাওয়াত্রা এবং মালয়েশিয়ার দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী তুন আব্দুল রাজাক ও তার ছেলে ষষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাকের নামও এই বিরল তালিকায় রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশেও একই পরিবারের একাধিক প্রজন্ম জাতিসংঘের মঞ্চে নিজ দেশের প্রতিনিধিত্ব করেছে। জর্ডানের হাশেমি রাজপরিবারের বাদশাহ হুসেইন বিন তালাল ও তার উত্তরসূরি বাদশাহ দ্বিতীয় আবদুল্লাহ জাতিসংঘে বক্তব্য দিয়েছেন। কাতারের আল থানি পরিবারের সাবেক আমির শেখ হামাদ বিন খলিফা ও বর্তমান আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানিও জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে নিজ দেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন।
সিরিয়ার আসাদ পরিবারের পিতা ও পুত্রও দেশটির শীর্ষ পদে থেকে জাতিসংঘের মঞ্চে বক্তব্য দিয়েছেন। একইভাবে আফ্রিকার গ্যাবন, ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো (ডিআর কঙ্গো) ও টোগোর শীর্ষ রাজনৈতিক পরিবারগুলোর ক্ষেত্রেও একাধিক প্রজন্মের আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিত্বের ইতিহাস রয়েছে।
সব মিলিয়ে, বিশ্ব কূটনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে একই পরিবারের একাধিক প্রজন্মের উপস্থিতি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ও পারিবারিক ধারাবাহিকতার একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। বাংলাদেশের জিয়া পরিবারের তিন সদস্যের জাতিসংঘের মঞ্চে প্রতিনিধিত্ব সেই বৈশ্বিক ধারার সঙ্গেই একটি নতুন অধ্যায় যুক্ত করছে।
