শুক্রবার ট্রাম্প দাবি করেন, ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজের সরকারের সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছেছে ওয়াশিংটন। চুক্তির আওতায় দেশটির ৬ হাজার ৫০০ কোটি ব্যারেলের বেশি প্রমাণিত তেলসম্পদের ওপর যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বেশি নিয়ন্ত্রণ পাবে বলে জানান তিনি।
তবে চুক্তির বিস্তারিত শর্ত এখনো প্রকাশ করা হয়নি। জানা গেছে, এতে ভেনেজুয়েলার ১৭টি কৌশলগত তেলক্ষেত্র অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তেল উত্তোলনে যুক্তরাষ্ট্র সরকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্বে কাজ করবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প চুক্তিটিকে ‘বিশ্বের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জ্বালানি তেল চুক্তি’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
কতটা তেল রয়েছে চুক্তির আওতায়
চুক্তিতে থাকা ৬ হাজার ৫০০ কোটি ব্যারেল তেল ভেনেজুয়েলার মোট প্রমাণিত মজুতের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। মার্কিন সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সাল পর্যন্ত দেশটিতে প্রায় ৩০ হাজার ৩০০ কোটি ব্যারেল প্রমাণিত তেল মজুত ছিল। বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণিত তেল মজুতও ভেনেজুয়েলার।
তবে চুক্তিতে উল্লেখ করা তেলের পরিমাণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কয়েকজন বিশ্লেষক। তাঁদের মতে, চুক্তির পূর্ণাঙ্গ শর্ত প্রকাশ না হওয়ায় এই পরিমাণের প্রকৃত তাৎপর্য এখনই নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন।
জ্বালানি বাজার গবেষক রোরি জনস্টনের মতে, ৬ হাজার ৫০০ কোটি ব্যারেলের হিসাবটি বিভ্রান্তিকর হতে পারে। চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয় এখনো অজানা থাকায় এই সংখ্যাকে রাজনৈতিক প্রচারের হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহার করা হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের তেল সরবরাহে কী প্রভাব পড়বে
ট্রাম্পের দাবি, ভেনেজুয়েলার সঙ্গে চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তেলের মজুত দ্বিগুণেরও বেশি বাড়তে পারে। মার্কিন সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ যুক্তরাষ্ট্রের প্রমাণিত তেল মজুত ছিল প্রায় ৪ হাজার ৬০০ কোটি ব্যারেল।
দেশটির কৌশলগত তেল মজুতও আগের তুলনায় অনেক কমেছে। জরুরি পরিস্থিতিতে জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে ব্যবহৃত এই মজুতের ধারণক্ষমতা প্রায় ৭১ কোটি ৪০ লাখ ব্যারেল হলেও বর্তমানে সেখানে রয়েছে প্রায় ২৮ কোটি ৯৭ লাখ ব্যারেল।
এমন পরিস্থিতিতে ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদকে নিজেদের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছে ট্রাম্প প্রশাসন।
চুক্তির পেছনে কী ঘটেছে
ভেনেজুয়েলা ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের নাটকীয় পরিবর্তন শুরু হয় ২০২৬ সালের শুরুতে। তখন দেশটির প্রেসিডেন্ট ছিলেন নিকোলা মাদুরো। তাঁর বিরুদ্ধে বিতর্কিত নির্বাচন ও রাজনৈতিক বিরোধীদের দমন-পীড়নের অভিযোগ ছিল।
দীর্ঘদিন ধরেই ট্রাম্প ও মাদুরোর মধ্যে বিরোধ চলছিল। গত ৩ জানুয়ারি সেই উত্তেজনা চরমে পৌঁছায়। ট্রাম্প প্রশাসনের অভিযানে মাদুরোকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়া হয়। বর্তমানে তিনি নিউইয়র্কে মাদক ও অস্ত্রসংক্রান্ত অভিযোগে বিচারের অপেক্ষায় রয়েছেন।
এরপর ভেনেজুয়েলার সরকার পরিচালনায় দেলসি রদ্রিগেজকে সমর্থন দেয় ট্রাম্প প্রশাসন। একই সময়ে ওয়াশিংটন ভেনেজুয়েলার তেল রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব নেওয়ার ঘোষণা দেয়।
সমালোচকদের অভিযোগ, তেলসম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য রদ্রিগেজ সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
কেন এখন চুক্তির ঘোষণা
চুক্তির সময়টিও তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে অস্থিরতার কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বিশ্ববাজারে তেলের দামেও।
যুক্তরাষ্ট্রে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনেও জীবনযাত্রার ব্যয় ও জ্বালানির দাম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যু হতে পারে। ফলে ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণকে মার্কিন অর্থনীতির জন্য লাভজনক হিসেবে তুলে ধরছেন ট্রাম্প।
তিনি দাবি করেছেন, নতুন চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্রে তেলের সরবরাহ বাড়বে এবং সাধারণ মানুষের জন্য জ্বালানির দাম কমবে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওও চুক্তিটিকে ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেছেন। তাঁর দাবি, এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিম গোলার্ধে স্থিতিশীল জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারবে এবং ভেনেজুয়েলার অর্থনীতিতেও নতুন বিনিয়োগ আসবে।
দেলসি রদ্রিগেজের অবস্থান
ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজও চুক্তিটিকে তাঁর সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হিসেবে দেখছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বার্তায় তিনি এটিকে ‘ঐতিহাসিক’ চুক্তি বলে উল্লেখ করেছেন।
রদ্রিগেজের দাবি, চুক্তির মাধ্যমে ভেনেজুয়েলার অর্থনীতিতে বড় ধরনের বিনিয়োগ আসবে এবং দেশটির জ্বালানি অবকাঠামো পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি হবে।
দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক সংকটে থাকা ভেনেজুয়েলা উচ্চ মূল্যস্ফীতি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকট ও ব্যাপক অভিবাসনের সমস্যায় রয়েছে। দেশটির অর্থনৈতিক দুরবস্থার জন্য একদিকে সরকারের দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করা হয়, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞাকেও বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন বিশ্লেষকেরা।
১০০ বছরের ব্যবহারের অধিকার?
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদ ১০০ বছর পর্যন্ত ব্যবহারের অধিকার পেতে পারে। তবে এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কোনো শর্ত প্রকাশ করা হয়নি।
ভেনেজুয়েলার সরকার জানিয়েছে, চুক্তি থেকে দেশটি বিপুল কর ও বিনিয়োগ পাওয়ার আশা করছে। তাদের হিসাবে, প্রায় ২০ হাজার ৯০০ কোটি ডলার কর এবং ১০ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ আসতে পারে।
সমালোচনা ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্ন
চুক্তিটি নিয়ে ইতোমধ্যে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়েছে। সমালোচকদের মতে, ভেনেজুয়েলার প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার এই উদ্যোগ দেশটির সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন তুলছে।
লাতিন আমেরিকায় ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের হস্তক্ষেপের ইতিহাসের সঙ্গে বর্তমান ঘটনাকে মিলিয়ে দেখছেন অনেকে। তাঁদের অভিযোগ, ভেনেজুয়েলার অর্থনৈতিক দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে দেশটির তেলসম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র।
অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসন এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে।
সব মিলিয়ে নতুন এই চুক্তি শুধু ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদের ভবিষ্যৎই নির্ধারণ করবে না, বরং ওয়াশিংটন ও কারাকাসের সম্পর্ক এবং লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবের দিকও নতুন করে নির্ধারণ করতে পারে।
