শুক্রবার (৯ অক্টোবর) দুপুরে দুর্গাপূজা উপলক্ষে সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) উদ্যোগে আয়োজিত মতবিনিময় ও অনুদান বিতরণ অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন বাণিজ্যমন্ত্রী।
তিনি বলেন, বন্দরের টার্মিনাল পরিচালনা নিয়ে যে চুক্তি হয়েছে, তার মূল উদ্দেশ্য সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। চুক্তিটি একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য করা হয়েছে। মেয়াদ শেষে বাংলাদেশ চাইলে তা নবায়ন করবে, অন্যথায় চুক্তির অবসান ঘটাবে।
খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, ‘এই চুক্তিকে দেশ বিক্রির চুক্তি যারা বলছেন, সেটি সস্তা ও অমূলক একটা কথা।’
চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে বড় নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব দুবাইভিত্তিক বৈশ্বিক টার্মিনাল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে ১৫ বছর মেয়াদি কনসেশন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তিটি নিয়ে বিভিন্ন মহলে সমালোচনা চলছে।
এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, দেশের বাইরের বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি দেশীয় বিনিয়োগকারীদের নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে হলে উৎপাদন ও রপ্তানি ব্যয়কে বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় প্রতিযোগিতামূলক পর্যায়ে নিয়ে আসতে হবে।
তিনি প্রশ্ন রাখেন, সরকার বাংলাদেশকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার উপযোগী অবস্থানে নিতে না পারলে কীভাবে নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট করবে?
মন্ত্রী বলেন, এ কারণেই সরকার চট্টগ্রাম বন্দরের দক্ষতা ও কার্যকারিতা বাড়াতে চায়। দেশের সামগ্রিক দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যেই এনসিটি পরিচালনা নিয়ে এ চুক্তি করা হয়েছে।
চুক্তির ফলে বন্দরে কর্মরত শ্রমিক-কর্মচারীদের চাকরি ও আর্থিক সুবিধার ওপর কী প্রভাব পড়বে, সে বিষয়েও কথা বলেন খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি বলেন, সরকার নিশ্চিত হয়েছে, বন্দরে বর্তমানে যারা কাজ করছেন, তাঁদের কেউ কর্মচ্যুত হবেন না। বরং দক্ষতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের সুযোগ-সুবিধাও বাড়বে বলে আশা করছে সরকার।
মন্ত্রী বলেন, বর্তমানে যে বেতনে কর্মীরা কাজ করছেন, ভবিষ্যতে দক্ষতা বৃদ্ধির সুফল হিসেবে তাঁদের পারিশ্রমিকও বাড়বে।
যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানিতে অবস্থান ফিরে পাওয়ার আশা
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের অবস্থান অবনমন প্রসঙ্গেও কথা বলেন বাণিজ্যমন্ত্রী।
তিনি বলেন, চীন দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে তৈরি পোশাকের অন্যতম প্রধান রপ্তানিকারক দেশ এবং তারা নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে। অন্যদিকে, ভিয়েতনামের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য সুবিধা থাকায় দেশটি পোশাক রপ্তানিতে কখনো বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে গেছে, আবার বাংলাদেশও পরে সেই অবস্থান ফিরে পেয়েছে।
খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, সরকার বিশ্বাস করে, আগামী দিনে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিকারকেরা আবারও তাঁদের আগের অবস্থান ফিরে পেতে সক্ষম হবেন।
সিলেটে উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে যা বললেন মন্ত্রী
এর আগে দুর্গাপূজা উপলক্ষে সিলেট সিটি করপোরেশনের আয়োজনে মতবিনিময় ও অনুদান বিতরণ অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন বাণিজ্যমন্ত্রী। সেখানে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, সড়ক অবকাঠামো, পানি সংকট, হরিজন সম্প্রদায়ের আবাসন এবং চা-বাগানের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে সরকারের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন তিনি।
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বিষয়ে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, ‘আমরা হোমোজিনিয়াস (সমজাতি) একটা নেশন। দেখতে এক রকম, চালচলন এক রকম, কথাবার্তা এক রকম এবং আমাদের সম্প্রীতি সবসময়ই অটুট—এটাই আমাদের শক্তি।’
সিলেটের ঐতিহ্যবাহী কিন ব্রিজের বিষয়ে তিনি বলেন, ব্রিজটি আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত হওয়ায় এর বয়স অনেক হয়েছে। তাই পুরোনো ব্রিজের পাশেই একটি দৃষ্টিনন্দন নতুন ব্রিজ নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হচ্ছে।
নগরের সড়ক উন্নয়ন প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, সিলেট মহানগর ও এর বাইরের বিভিন্ন সড়ক নির্মাণ ও সংস্কারের জন্য ইতোমধ্যে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। চলতি শীত মৌসুম থেকে এসব কাজ শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তিনি জানান, সিলেট সিটি করপোরেশনের ৪২টি ওয়ার্ডে মোট সড়কের দৈর্ঘ্য প্রায় ৮০০ কিলোমিটার। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত কমবেশি ৪৫০ কিলোমিটার সড়কের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। ফলে বাকি রয়েছে প্রায় ৩৫০ কিলোমিটার সড়ক।
মন্ত্রী বলেন, গত ৫৫ বছরে যে পরিমাণ সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে, বাকি কাজ শেষ করতে আরও ১১০ বছর লাগবে না। আগামী তিন থেকে চার বছরের মধ্যে অবশিষ্ট সড়ক নির্মাণ ও সংস্কারের কাজ এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে সরকার একটি বড় প্রকল্প গ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছে।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের জমে থাকা উন্নয়নকাজ দ্রুত সম্পন্ন করতে এমন একটি প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে, যার মাধ্যমে বাকি সড়কগুলোর নির্মাণ ও সংস্কারের কাজ শুরু করা সম্ভব হবে।
সিলেটের পানি সংকট সমাধানে বড় প্রকল্পের উদ্যোগ
সিলেটের পানি সংকট সমাধানেও বড় প্রকল্প নেওয়ার কথা জানান বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, সিটি করপোরেশনের অধীনে এ বিষয়ে একটি বড় প্রকল্প জমা রয়েছে। তবে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। অতিরিক্ত টিউবওয়েল ব্যবহারের কারণে পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে বিকল্প পানির উৎস ব্যবহারের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি। মন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, সুরমা, কুশিয়ারা ও চেঙ্গেরখাল থেকে পানি উত্তোলন করে পরিশোধনের মাধ্যমে নগরবাসীর ব্যবহারের উপযোগী করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে সিলেট নগরের পানির চাহিদা পূরণে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
হরিজন সম্প্রদায়ের জন্য স্বতন্ত্র আবাসনের পরিকল্পনা
সিলেট নগরের কাষ্টঘর এলাকায় বসবাসরত হরিজন সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের বিষয়েও কথা বলেন খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।
তিনি বলেন, সিটি করপোরেশনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এ জনগোষ্ঠীর অনেকেই মানবেতর পরিবেশে বসবাস করছেন। তিনি নিজে তাঁদের বাসস্থানে গিয়ে পরিস্থিতি দেখেছেন বলেও জানান।
মন্ত্রী বলেন, অনেক ক্ষেত্রে একটি ছোট কক্ষেই বাবা-মা, ছেলে ও ছেলের স্ত্রীসহ পরিবারের একাধিক সদস্যকে বসবাস করতে হচ্ছে। এ ধরনের পরিবেশ অস্বাস্থ্যকর এবং স্বাভাবিক সামাজিক জীবনযাপনের জন্য অনুপযোগী।
এ পরিস্থিতি বিবেচনায় হরিজন সম্প্রদায়ের জন্য স্বতন্ত্র আবাসনের ব্যবস্থা করতে একটি পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি। এর মাধ্যমে তাঁদের উন্নত ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাসের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন মন্ত্রী।
চা-বাগানে সরকারি স্কুল নির্মাণের উদ্যোগ
সিলেটের চা-বাগানগুলোতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ঘাটতির বিষয়টিও তুলে ধরেন বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, অনেক চা-বাগানে স্কুল নেই। ফলে সেখানকার শিশুদের শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে সরকারি উদ্যোগে স্কুল নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির জানান, সিলেট সিটি করপোরেশনের একটি নির্বাচনি আসনের মধ্যেই ১২টি চা-বাগান রয়েছে। এসব এলাকার শিশুদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে সরকার একটি উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে।
অনুষ্ঠানে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীর সভাপতিত্বে রাজনৈতিক নেতারা ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা বক্তব্য দেন।
