আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা বিভিন্ন আলামত ঢাকায় অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ফরেনসিক ল্যাবে পরীক্ষা করা হয়। সেসব নমুনার ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
রোববার (১১ অক্টোবর) দুপুরে রংপুর মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কার্যালয়ে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পরিদর্শক জিন্নাত আলী ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদন ও তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে এসব তথ্য নিশ্চিত করেন। এ সময় তিনি চার হত্যাকাণ্ডের তদন্ত, ফরেনসিক প্রতিবেদন, আলামত বিশ্লেষণ এবং হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য কারণ নিয়েও বিস্তারিত জানান।
তদন্ত কর্মকর্তা জিন্নাত আলী বলেন, ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদন, উদ্ধার হওয়া আলামত, আসামিদের আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি এবং সাক্ষীদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করে চার হত্যাকাণ্ডে সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে। ঘটনাস্থলে নিহত চারজন ও এই দুই আসামি ছাড়া অন্য কারও উপস্থিতির প্রমাণ ডিএনএ পরীক্ষায় পাওয়া যায়নি বলেও জানান তিনি।
তিনি আরও জানান, মামলাটির তদন্তকাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। আগামী এক মাসের মধ্যে দুই আসামির বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে।
খেজুরের বিচি, শসা ও বিড়ির অংশে ডিএনএ
তদন্ত কর্মকর্তা জানান, গত বৃহস্পতিবার ঢাকার সিআইডি কার্যালয় থেকে ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদন হাতে পেয়েছে তদন্তকারী সংস্থা। এর আগে গত ৩১ আগস্ট ও ১ সেপ্টেম্বর হত্যাকাণ্ডের ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা ৩১ ধরনের নমুনা পরীক্ষার জন্য সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো হয়েছিল।
এসব নমুনার মধ্যে ছিল খেজুরের বিচি, শসার অংশবিশেষ, ফল কাটার ছুরি, ইয়াবা সেবনের ফয়েল, সিগারেট বা বিড়ির শেষাংশ, বেসিনের দাগ এবং দুই আসামির রক্তের নমুনাসহ বিভিন্ন আলামত। পরীক্ষার পর একাধিক নমুনায় দুই আসামির ডিএনএ পাওয়া যায়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, খেজুরের বিচিতে মুগ্ধ দাসের এবং শসার টুকরায় সিদ্ধার্থ দাসের ডিএনএ শনাক্ত হয়েছে। অন্যদিকে, বিড়ির শেষাংশে দুজনেরই ডিএনএ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া নিহত প্রীতিলতা চক্রবর্তীর গলায় প্যাঁচানো গামছার নমুনায় মুগ্ধ দাসের ডিএনএ শনাক্ত হওয়ার তথ্য জানিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা।
ধর্ষণের কোনো আলামত মেলেনি
একই পরিবারের চারজনকে হত্যার পর নিহত গণপতি চক্রবর্তীর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন কি না, তা নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন ও সন্দেহ দেখা দিয়েছিল। বিষয়টি নিশ্চিত করতে মা ও মেয়ের ভ্যাজাইনাল সোয়াবের নমুনাও ডিএনএ পরীক্ষার জন্য সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো হয়।
তবে পরীক্ষার প্রতিবেদনে ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা জিন্নাত আলী।
তিনি জানান, ফরেনসিক পরীক্ষার প্রতিবেদন ছাড়াও আসামিদের আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি, উদ্ধার হওয়া আলামত, আদালতে সাক্ষ্য দেওয়া চারজন এবং পুলিশের কাছে জবানবন্দি দেওয়া ৫৬ জনের বক্তব্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এসব তথ্য পর্যালোচনা করেই হত্যাকাণ্ডে কার কী ভূমিকা ছিল, তা নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
চারজনকে যেভাবে হত্যা করা হয়, জানাল পুলিশ
তদন্ত কর্মকর্তা জিন্নাত আলীর ভাষ্য অনুযায়ী, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীকে সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস দুজন মিলে হত্যা করেন। তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তীকে হত্যা করেন মুগ্ধ দাস। তাঁদের কলেজপড়ুয়া মেয়ে আগামী চক্রবর্তীকে হত্যা করেন সিদ্ধার্থ দাস। আর ১২ বছর বয়সী ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীকে হত্যা করেন দুই আসামি মিলে।
তদন্তে উঠে আসা তথ্য তুলে ধরে জিন্নাত আলী বলেন, আসামিরা জানতে পেরেছিলেন, অবসরের পর পাওয়া ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা ব্যাংক থেকে তুলে বাড়িতে রেখেছেন গণপতি চক্রবর্তী। এ ছাড়া ওই বাড়িতে অনেক স্বর্ণালংকার রয়েছে বলেও তাঁদের ধারণা ছিল।
তদন্ত কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, মূলত চুরির উদ্দেশ্যেই আসামিরা বাড়ির ছাদ দিয়ে প্রবেশ করেন। পরে পরিবারের সদস্যদের একে একে হত্যা করেন। অর্থ ও স্বর্ণালংকার পাওয়ার আশায় বাড়িতে প্রবেশের পরই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন চারজন, জবানবন্দি ৫৬ জনের
মামলার তদন্তে সাক্ষ্য ও জবানবন্দিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে জানিয়েছেন পরিদর্শক জিন্নাত আলী। তাঁর তথ্য অনুযায়ী, মামলায় এলাকার শান্ত দাস, সীমান্ত দাস, দুলাল শর্মা এবং কেন্দ্রীয় মহাশ্মশানের কেয়ারটেকার বিদ্যুৎ দাস আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন। এ ছাড়া পুলিশের কাছে জবানবন্দি দিয়েছেন ৫৬ জন।
ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদন, ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া আলামত, আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি এবং সাক্ষীদের বক্তব্য সমন্বিতভাবে বিশ্লেষণ করে তদন্ত শেষ করা হয়েছে বলে জানান তিনি। আগামী এক মাসের মধ্যে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
২২ আগস্ট বাড়ি থেকে উদ্ধার হয় চারজনের মরদেহ
এর আগে গত ২২ আগস্ট রাতে রংপুর নগরের মাছুয়াপাড়ায় নিজেদের বাড়ি থেকে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী এবং তাঁদের দুই সন্তান আগামী ও আয়ুশ চক্রবর্তীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। একই পরিবারের চার সদস্যের মৃত্যুর ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
এ ঘটনায় পরদিন ২৩ আগস্ট নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে রংপুর নগরের কোতোয়ালি থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন।
পরে পুলিশ গণপতি চক্রবর্তীর প্রতিবেশী সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসকে গ্রেপ্তার করে। আদালতের মাধ্যমে তাঁদের রংপুর কারাগারে পাঠানো হয়। পরবর্তী সময়ে আদালতে হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দেন দুই আসামি। মামলাটির তদন্ত প্রথমে কোতোয়ালি থানা-পুলিশ শুরু করলেও পরে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় রংপুর মহানগর গোয়েন্দা পুলিশকে।
নির্মাণাধীন তিনতলা ভবনে থাকত পরিবারটি
নিহত গণপতি চক্রবর্তী রংপুর জিলা স্কুলের হিসাববিজ্ঞানের শিক্ষক ছিলেন। তাঁর মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছিলেন। আর ১২ বছর বয়সী ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী রংপুর জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।
পরিবারটি মাছুয়াপাড়ায় একটি নির্মাণাধীন তিনতলা ভবনের দ্বিতীয় তলায় বসবাস করত। সেখান থেকেই তাঁদের চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
একই পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার এই মামলায় ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর তদন্ত শেষ হওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ। এখন আদালতে অভিযোগপত্র দাখিলের অপেক্ষা।
