সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও শেরেবাংলা নগর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শামসুজ্জোহা সরকার ঢাকার আদালতে এ রিমান্ড আবেদন করেন। মামলার তদন্তের স্বার্থে আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
রিমান্ড আবেদনে গাজী নজরুল ইসলাম ও মাকসুদা বেগমকে জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজনীয়তার পক্ষে পাঁচটি কারণ উল্লেখ করেছে পুলিশ।
প্রথমত, মরিয়ম খাতুন যখন ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন, তখন গাজী নজরুল ইসলাম ও তার প্রথম স্ত্রী মাকসুদা বেগম একই বাসায় অবস্থান করছিলেন বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আত্মহত্যার সময় ওই বাসায় থাকা দুজনের কোনো ধরনের প্রভাব, ভূমিকা বা সংশ্লিষ্টতা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে চান তদন্ত কর্মকর্তারা।
দ্বিতীয়ত, মরিয়ম খাতুনকে আত্মহত্যায় প্ররোচনা, উসকানি, মানসিক চাপ কিংবা ভয়ভীতি দেখানো অথবা অন্য কোনো উপায়ে আত্মহত্যায় সহায়তা করার ক্ষেত্রে গাজী নজরুল ও মাকসুদা বেগমের কোনো ভূমিকা ছিল কি না, সে বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করতে চায় পুলিশ।
তৃতীয়ত, মামলার এজাহারভুক্ত পলাতক আসামি ওবায়দুর রহমানের ভূমিকা সম্পর্কে জানতে চান তদন্ত কর্মকর্তারা। একই সঙ্গে তার বর্তমান অবস্থান শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যেও আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন বলে রিমান্ড আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
চতুর্থত, মরিয়ম খাতুনের আত্মহত্যার ঘটনায় গাজী নজরুল ও মাকসুদা ছাড়া আরও কোনো অজ্ঞাত ব্যক্তি জড়িত ছিলেন কি না, তা শনাক্ত করার প্রয়োজন রয়েছে বলে আবেদনে বলা হয়েছে। জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করার পাশাপাশি তাদের গ্রেপ্তারের জন্যও আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পঞ্চমত, মরিয়ম খাতুনের মৃত্যুর প্রকৃত ঘটনা এবং এর পেছনের মূল রহস্য উদঘাটনের জন্য গাজী নজরুল ইসলাম ও তার প্রথম স্ত্রী মাকসুদা বেগমকে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন বলে জানিয়েছে তদন্তকারী সংস্থা।
এর আগে রোববার রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানাধীন ন্যাম ভবনের ৫ নম্বর ভবনের তৃতীয় তলার ২০৩ নম্বর ফ্ল্যাট থেকে মরিয়ম খাতুনের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে এ ঘটনায় তার বাবা মো. মাসুম বিল্লাহ বাদী হয়ে শেরেবাংলা নগর থানায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে একটি মামলা দায়ের করেন।
মামলায় সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম, তার প্রথম স্ত্রী মাকসুদা বেগম এবং মাকসুদার ভাই ওবায়দুর রহমানকে আসামি করা হয়েছে।
মামলার এজাহারে মরিয়মের বাবা অভিযোগ করেন, গত জুন মাসে গাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী তার মেয়ের বিয়ে হয়। সংসদ সদস্য হওয়ায় গাজী নজরুল তার প্রথম স্ত্রী মাকসুদা বেগমসহ শেরেবাংলা নগরের মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ এলাকায় সংসদ ভবনের বিপরীতে অবস্থিত ন্যাম ভবনে বসবাস করতেন বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
এজাহারে আরও অভিযোগ করা হয়, বিয়ের পর থেকেই বিভিন্ন বিষয়কে কেন্দ্র করে গাজী নজরুল ইসলাম ও তার প্রথম স্ত্রী মাকসুদা বেগম মরিয়মকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করতেন। এসব বিষয় মরিয়ম বিভিন্ন সময়ে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে তার পরিবারের সদস্যদের জানিয়েছিলেন বলেও এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
এজাহার অনুযায়ী, রোববার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে গাজী নজরুল ইসলাম মরিয়মের বাবা মো. মাসুম বিল্লাহকে ফোন করে দ্রুত বাসায় যেতে বলেন। খবর পেয়ে তিনি সেখানে গিয়ে অনেক লোকজন দেখতে পান। পরে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করে মরিয়মকে ওড়না দিয়ে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান।
পরে পুলিশের সহায়তায় ঘরের দরজা ভেঙে মরিয়মের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ সময় বিছানার ওপর মরিয়মের লেখা একটি সুইসাইড নোট পাওয়া যায় বলেও মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
মরিয়মের বাবার অভিযোগ, আসামিদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে এবং তাদের প্ররোচনার কারণেই তার মেয়ে আত্মহত্যা করেছেন। তবে মামলার এসব অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা হচ্ছে।
এদিকে গত জুলাই মাসে মরিয়ম খাতুনের সঙ্গে গাজী নজরুল ইসলামের ‘ব্যক্তিগত মুহূর্তের’ কয়েকটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। ভিডিওগুলো ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনেও আলোচনায় আসে।
এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ২২ জুলাই গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কার করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, সাংগঠনিক তদন্তে তার নৈতিক স্খলন প্রমাণিত হওয়ায় দলের গঠনতন্ত্রের ৬২ নম্বর ধারা অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিষয়টি নির্বাচন কমিশনকেও জানানো হয়।
ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর অনৈতিক সম্পর্কের প্রতিবাদ এবং ভিডিও ফাঁসের সন্দেহে মারধর ও শ্বাসরোধ করে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে গত ২১ জুলাই পল্লবী থানায় একটি মামলা করেছিলেন গাড়িচালক ও মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমান।
ওই মামলায় গাজী নজরুল ইসলামকে আসামি করা হয়। পরে গত ১০ আগস্ট হাইকোর্ট তাকে আট সপ্তাহের জামিন দেন।
তবে বর্তমানে মরিয়ম খাতুনের আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় সেই ওবায়দুর রহমানকেই এজাহারভুক্ত আসামি করা হয়েছে। তাকে এখনো পলাতক হিসেবে উল্লেখ করেছে পুলিশ এবং তার অবস্থান শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে বলে রিমান্ড আবেদনে জানানো হয়েছে।
এদিকে মরিয়মের মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা মামলার তদন্তে পুলিশ ঘটনাটির পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি, আসামিদের ভূমিকা, সুইসাইড নোট এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যসহ বিভিন্ন বিষয় খতিয়ে দেখছে। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে মামলার প্রকৃত ঘটনা ও মৃত্যুর পেছনের কারণ সম্পর্কে আরও তথ্য পাওয়ার আশা করছে তদন্তকারী সংস্থা।
