মারধরের ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দারা মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) শিশু ও তার মাকে কলাপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন। এর আগে গত শুক্রবার রাতে উপজেলার চাকামইয়া ইউনিয়নের গামুরবুনিয়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। তবে মারধরের পর ভয় ও আতঙ্কে ওই শিশু এবং তার মা টানা চার দিন বাড়ি থেকে বের হননি বলে জানা গেছে।
ভুক্তভোগী শিশুটির নাম জিসান (১২)। সে গামুরবুনিয়া গ্রামের মৃত বাচ্চু হাওলাদারের ছেলে। তার মা নাজমা বেগমের অভিযোগ, ছেলেকে মানিব্যাগ চুরির অপবাদ দেওয়ার পাশাপাশি তাকেও মারধর করা হয়েছে।
নাজমা বেগম জানান, প্রায় দেড় বছর আগে তার স্বামী বাচ্চু হাওলাদার মারা যান। এর আগে জমি বন্ধক রাখার বিনিময়ে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হাফিজুর রহমান চুন্নুর ছোট ভাই আবদুল হাইকে এক লাখ টাকা দিয়েছিলেন তার স্বামী। তবে ওই টাকা লেনদেনের বিষয়ে কোনো লিখিত কাগজপত্র ছিল না।
স্বামীর মৃত্যুর পর জমি বন্ধকের ওই এক লাখ টাকা লেনদেনের লিখিত প্রমাণ নেওয়ার জন্য কয়েক দফা আবদুল হাইয়ের কাছে যান নাজমা। তার অভিযোগ, এ নিয়ে চুন্নু ও তার ভাই ক্ষুব্ধ ছিলেন।
নাজমা বলেন, গত শুক্রবার চুন্নু ও তার ভাই মিলে তার ছেলে জিসান ও তাকে নিজেদের ঘরে ডেকে নেন। সেখানে মানিব্যাগ চুরির অপবাদ দিয়ে বাঁশের লাঠি দিয়ে তাদের মারধর করা হয়। তার দাবি, জমি বন্ধকের এক লাখ টাকা দেওয়ার লিখিত প্রমাণ চাওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়েই তাদের ওপর এই হামলা চালানো হয়েছে।
মারধরের পর চার দিন বাড়ি থেকে বের না হওয়ার বিষয়ে নাজমা বলেন, ঘটনার পর তারা ভয় ও আতঙ্কের মধ্যে ছিলেন। পরে স্থানীয় বাসিন্দারা বিষয়টি জানতে পেরে মঙ্গলবার তাদের কলাপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে ভর্তি করেন।
কলাপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘সকালে বাচ্চাটা আর ওর মা এসে ভর্তি হয়েছে। দুজনের শরীরেই আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। যে জায়গাগুলোতে আঘাত করা হয়েছে, সেখানে কালো দাগ হয়ে গেছে। আমরা তাদের চিকিৎসা দিচ্ছি।’
তবে শিশু ও তার মাকে মারধরের অভিযোগ অস্বীকার না করে ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হাফিজুর রহমান চুন্নু। অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘ওই ছেলে চোর ও এলাকার সব জায়গায় চুরি করে বেড়ায়। সেদিন চুরি করার পর প্রশাসনকে (পুলিশ) বলেছি। তারা বলেছে, দুই-একটা পিডান-পুডান দিয়ে ছেড়ে দিন।’
শিশুটির মাকে কেন মারধর করা হয়েছে—এমন প্রশ্নের জবাবে চুন্নু বলেন, ‘ওরা এলাকার জাত চোর, সবাই জানে। আর আমরাও মানবিক। ওর মা সম্পর্কে আমার ভাগনি হয়। ওর মাকে বলেছি পোলা ঢাকা পাঠাইয়া দিতে।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কলাপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘এ রকম কোনো বিষয়ে আমাকে জানানো হয়নি। আর এমন অপেশাদার কথা আমরা বলিনি।’
কারণ দর্শানোর নোটিশ
এদিকে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হাফিজুর রহমান চুন্নুকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে পটুয়াখালী জেলা বিএনপি।
বুধবার বেলা ১১টার দিকে জেলা বিএনপির সভাপতি স্নেহাংশু সরকার কুট্টি ও সাধারণ সম্পাদক মজিবুর রহমান (টোটন) স্বাক্ষরিত এক চিঠির মাধ্যমে তাকে এ নোটিশ দেওয়া হয়।
নোটিশে হাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে ১২ বছর বয়সী এক শিশু ও তার মায়ের ওপর নির্যাতনের অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এ-সংক্রান্ত একটি ভিডিও জেলা বিএনপির নেতাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে বলেও নোটিশে উল্লেখ করা হয়।
এ ঘটনায় কেন তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, তা লিখিতভাবে ব্যাখ্যা করতে বলা হয়েছে। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের কাছে কারণ দর্শানোর জবাব দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগ, পাল্টা বক্তব্য এবং দলীয় কারণ দর্শানোর নোটিশের মধ্য দিয়ে ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে।
