ঢাকা থেকে ১ আগস্ট মস্কোয় পৌঁছানোর পরদিন প্রায় আড়াই ঘণ্টার ফ্লাইটে মুরমানস্কে যাই। এখান থেকেই বিশেষ আইসব্রেকারে করে শুরু হয় উত্তর মেরু অভিযানের যাত্রা। অভিযানের আগে ৩ আগস্ট ঘুরে দেখা হয় মুরমানস্ক শহরের বিভিন্ন স্থান।
রাশিয়ার পরমাণু শক্তি সংস্থা রোসাটমের ‘আইসব্রেকার অব নলেজ’ কর্মসূচির মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের স্কুলশিক্ষার্থীদের আইসব্রেকারে করে উত্তর মেরু ভ্রমণের সুযোগ দেওয়া হয়। প্রতিযোগিতার মাধ্যমে এবার বাংলাদেশ থেকে এই বিরল সুযোগ পেয়েছে রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী।
বাংলাদেশের পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আরও ২১ জন শিক্ষার্থী এই অভিযানে অংশ নেয়। মস্কোতেই সবার সঙ্গে পরিচয় হয়। প্রত্যেক শিক্ষার্থীর সঙ্গে ছিলেন একজন করে অভিভাবক। বাংলাদেশের প্রতিনিধির সঙ্গে ছিলেন তাঁর বাবা।
৪ আগস্ট সকালে তাঁদের নিয়ে যাওয়া হয় মুরমানস্ক বন্দরে। সেখানে আইসব্রেকারের পাশাপাশি কয়েকটি যুদ্ধজাহাজও দেখা যায়। সামরিক নিয়ন্ত্রিত ওই এলাকায় নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিল রাশিয়ার নৌবাহিনী।
দীর্ঘ উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে একে একে শিক্ষার্থীদের আইসব্রেকারে তোলা হয়। অভিভাবকেরা ফিরে যান হোটেলে। জাহাজে ওঠার পর প্রথমে পুরো জাহাজ ঘুরিয়ে দেখানো হয়। কোথায় কী আছে, কী করা যাবে আর কী করা যাবে না—সবকিছু বুঝিয়ে দেওয়া হয়।
এরপর নোঙর তুলে উত্তর মেরুর উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে আইসব্রেকার।
কিন্তু যাত্রার শুরুটা মোটেও সহজ ছিল না। কয়েক ঘণ্টা পরই শুরু হয় প্রচণ্ড ঝড়। উত্তাল সমুদ্রের বিশাল ঢেউয়ে জাহাজ দুলতে থাকে ভয়াবহভাবে। অনেকের মধ্যেই দেখা দেয় ‘সি-সিকনেস’। শুরু হয় বমি, খাবারের প্রতি অনীহা। প্রথম দুই দিন অনেকটাই কেটে যায় মোশন সিকনেসের সঙ্গে লড়াই করে।
তবে কয়েক দিন পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করে। জাহাজে ওঠার তিন-চার দিন পর প্রথমবারের মতো চোখে পড়ে বরফের বিশাল স্তর। এর মধ্যেই এক সকালে জাহাজের আশপাশে দুটি পোলার বিয়ার দেখা যায়। কিন্তু তখন ঘুমিয়ে থাকায় সেই বিরল দৃশ্য নিজের চোখে দেখা হয়নি। পরে ছবি ও ভিডিও দেখে সেই মুহূর্তের অভিজ্ঞতা নিতে হয়।
জাহাজের ভেতরের পরিবেশ ছিল উষ্ণ ও স্বাভাবিক। কিন্তু বাইরে তাপমাত্রা নেমে যায় মাইনাস ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। তীব্র ঠান্ডা উপেক্ষা করে জাহাজের ওপরের অংশে দাঁড়িয়ে বরফে ঘেরা চারপাশের দৃশ্য উপভোগ করতেন অভিযাত্রীরা।
এই দীর্ঘ যাত্রায় বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে গড়ে ওঠে বন্ধুত্ব। বিশেষ করে ভারত, মিয়ানমারসহ এশিয়ার দেশগুলোর অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে তৈরি হয় ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। ইন্দোনেশিয়ার এক শিক্ষার্থী ছিলেন রুমমেট; তাঁর সঙ্গেও গড়ে ওঠে ভালো বন্ধুত্ব।
উত্তর মেরুতে বাংলাদেশের পতাকা
অবশেষে ৭ আগস্ট সকালে উত্তর মেরুর কাছাকাছি পৌঁছে যায় আইসব্রেকার। চারপাশে তখন শুধু বরফ আর বরফ। কোথায় নামা নিরাপদ, তা পরীক্ষা করে দেখছিলেন আয়োজকেরা।
বিকেলে অপেক্ষাকৃত পুরু বরফের একটি জায়গা নির্ধারণ করা হয়। সেখানে নামার সুযোগ পান অভিযাত্রীরা।
বরফের ওপর দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা হাতে তুলে নেওয়া হয়। সেই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল, উত্তর মেরুর মতো পৃথিবীর একেবারে প্রান্তে বাংলাদেশও যেন তাঁর সঙ্গে উপস্থিত।
৮ আগস্ট শুরু হয় ফেরার যাত্রা। জাহাজে চলতে থাকে নিয়মিত কার্যক্রম—সেমিনার, খাওয়াদাওয়া, বিশ্রাম আর ঘুম। বাইরে তখন শুধু বরফ আর পানি।
এর মধ্যেই ১২ আগস্ট ঘটে আরেকটি চমকপ্রদ ঘটনা। জাহাজে একজন রুশ বিশেষজ্ঞকে বাংলাদেশের মানচিত্রখচিত টি-শার্ট পরা অবস্থায় দেখা যায়। কথা বলে জানা যায়, তিনি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রায় এক বছর কাজ করেছেন।
বাংলাদেশে থাকার সময় তাঁর অনেক বন্ধুত্ব তৈরি হয়েছিল। এমনকি একটি গ্রামের বিয়েতেও অংশ নিয়েছিলেন তিনি। নিজের মুঠোফোনে সেই বিয়ের ছবিও দেখান। বাংলাদেশের মানুষের আতিথেয়তা ও ভালোবাসার গল্প শুনে মুগ্ধ হন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী।
পৃথিবীর এত দূরে একজন বিদেশি বিশেষজ্ঞকে বাংলাদেশের টি-শার্ট পরে থাকতে দেখে তৈরি হয় অন্যরকম গর্বের অনুভূতি।
ফেরার পথে আর তেমন মোশন সিকনেস হয়নি। অবশেষে ১৩ আগস্ট আবার মুরমানস্ক বন্দরে পা রাখেন অভিযাত্রীরা।
বরফে ঢাকা উত্তর মেরু, মাইনাস ১০ ডিগ্রি তাপমাত্রা, উত্তাল সমুদ্র আর পোলার বিয়ারের দেখা—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের এই কিশোরের উত্তর মেরু অভিযান হয়ে ওঠে জীবনের এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা।
