বাংলাদেশে এলপিজির দাম নির্ধারণ করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। তবে কমিশনের নির্ধারিত দামও অনেক ক্ষেত্রে বাজারে কার্যকর হচ্ছে না। বর্তমানে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের সরকারি নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা হলেও ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় তা বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায়।
দেশে প্রায় এক কোটি গ্রাহক এলপিজি ব্যবহার করেন। এর প্রায় ৮০ শতাংশই ব্যবহৃত হয় গৃহস্থালির রান্নার কাজে। বছরে দেশে এলপিজির চাহিদা ১৫ লাখ টনের বেশি। ফলে রান্নার গ্যাসের দাম বাড়লে সরাসরি চাপ পড়ে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর।
রাজধানীর মিরপুরের বেসরকারি চাকরিজীবী সাজ্জাদুর রহমান জানান, তাঁর পরিবারে প্রতি মাসে ১২ কেজির দুটি এলপিজি সিলিন্ডার প্রয়োজন হয়। সম্প্রতি একটি সিলিন্ডার তিনি কিনেছেন ২ হাজার ৪০০ টাকায়। তাঁর অভিযোগ, সরকারি সংস্থাগুলো নির্ধারিত দাম কার্যকর করতে না পারলেও সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি ব্যয়ের চাপ তৈরি হচ্ছে।
প্রতিবেশী দেশগুলোতে কত দাম
দেশে রান্নার কাজে মূলত পাইপলাইনের প্রাকৃতিক গ্যাস ও এলপিজি ব্যবহার করা হয়। ২০১৫ সালের পর থেকে আবাসিক গ্রাহকদের নতুন করে গ্যাস-সংযোগ দেওয়া বন্ধ রয়েছে। ফলে পাইপলাইনের গ্যাসের বিকল্প হিসেবে বাসাবাড়িতে এলপিজির ব্যবহার দ্রুত বেড়েছে।
দেশের চাহিদার বড় অংশ বেসরকারি কোম্পানিগুলো আমদানি করে সরবরাহ করে। আদালতের নির্দেশের পর ২০২১ সালের এপ্রিল থেকে মাসভিত্তিক এলপিজির দাম নির্ধারণ করছে বিইআরসি। উদ্দেশ্য ছিল ভোক্তাদের সাশ্রয়ী মূল্যে রান্নার গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা।
সর্বশেষ রোববার ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করেছে বিইআরসি। তবে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের এক খুচরা বিক্রেতা জানান, সরবরাহ কম থাকায় তাঁরা ১২ কেজির সিলিন্ডার ২ হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি করছেন। তাঁর দাবি, প্রতিদিন যেখানে ৩০টি সিলিন্ডার প্রয়োজন, সেখানে পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ১৫টি।
ভারতের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তেল কোম্পানি ইন্ডিয়ান অয়েল করপোরেশনের (আইওসিএল) তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় ১৪ দশমিক ২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের খুচরা দাম ৯৬৮ রুপি। বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রতি কেজির দাম দাঁড়ায় প্রায় ৮৭ টাকা। দিল্লি ও মুম্বাইয়ে দাম আরও কম।
বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, ভারতের সঙ্গে সরাসরি বাংলাদেশের এলপিজির দামের তুলনা করা কঠিন। তাঁর মতে, ভারতে সরকারি সংস্থাগুলো এলপিজি বিক্রি করে এবং তাদের অবকাঠামোগত সক্ষমতাও বেশি। বাংলাদেশে পরিবহন ব্যয়ের কারণে এলপিজির দাম তুলনামূলক বেশি হচ্ছে।
তিনি জানান, মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে এলপিজি কোম্পানিগুলোর জমি রয়েছে। সেখানে টার্মিনাল নির্মাণ করা গেলে বড় জাহাজে এলপিজি আমদানি সম্ভব হবে। এ ছাড়া চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তীর, বাগেরহাটের মোংলা ও টাঙ্গাইলের এলেঙ্গায় বড় মজুতাগার নির্মাণের সুযোগ রয়েছে। এসব অবকাঠামো তৈরি করতে তিন থেকে চার বছর সময় লাগতে পারে। এরপর এলপিজির দাম কমে আসতে পারে বলে তাঁর ধারণা।
ভারতে এলপিজিতে বিভিন্ন ধরনের সরকারি সহায়তাও রয়েছে। আইওসিএলের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে কার্যকর দামের মধ্যে সরাসরি ভর্তুকি অন্তর্ভুক্ত নেই। তবে দরিদ্র পরিবারগুলোকে সরকার সিলিন্ডারপ্রতি ৩০০ রুপি পর্যন্ত সহায়তা দেয়। পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তেল কোম্পানিগুলো অনেক সময় লোকসানেও আবাসিক এলপিজি বিক্রি করে।
ভারতের ‘দ্য হিন্দু’র এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত সেপ্টেম্বরে ১৪ দশমিক ২ কেজির সিলিন্ডারে পরোক্ষ ভর্তুকির পরিমাণ ছিল ২১০ রুপি। এই ভর্তুকি বাদ দিয়েও ১২ কেজির একটি সিলিন্ডারের দাম বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১ হাজার ৩০০ টাকার আশপাশে দাঁড়ায়।
শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বোয় সাড়ে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ৪ হাজার ৯৬৫ রুপি। বাংলাদেশি মুদ্রায় ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৪০০ টাকার কম।
পাকিস্তানে সম্প্রতি এলপিজির দাম ৮ শতাংশ বাড়িয়েছে দেশটির অয়েল অ্যান্ড গ্যাস রেগুলেটরি অথরিটি। প্রতি কেজির দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২৭৯ রুপি। বাংলাদেশি মুদ্রায় ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম পড়ে দেড় হাজার টাকার কিছু কম।
নেপাল অয়েল করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে ১৪ দশমিক ২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২ হাজার ৬০ রুপি। বাংলাদেশি মুদ্রায় ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম দাঁড়ায় ১ হাজার ৪০০ টাকার কিছু কম।
ভারত, শ্রীলঙ্কা ও নেপালে মোটামুটি সরকার নির্ধারিত দামেই এলপিজি বিক্রি হয়। পাকিস্তানে নির্ধারিত দামের চেয়ে কিছুটা বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব দেশের তুলনায় বাংলাদেশে নির্ধারিত দাম ও বাজারদরের ব্যবধান উল্লেখযোগ্য।
অবকাঠামো সংকটে বাড়ছে আমদানি ব্যয়
এলপিজি আমদানি ও সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ীদের মতে, বাংলাদেশে গভীর সমুদ্র থেকে এলপিজি আমদানির জন্য পর্যাপ্ত টার্মিনাল নেই। একই সঙ্গে পর্যাপ্ত মজুত সক্ষমতাও গড়ে ওঠেনি। ফলে ছোট জাহাজে করে এলপিজি আমদানি করতে হয়, এতে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যায়।
এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) সাবেক সভাপতি আজম জে চৌধুরী বলেন, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও জাহাজভাড়ার কারণে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে রয়েছে। গভীর সমুদ্রে টার্মিনাল নির্মাণ এবং মজুত সক্ষমতা বাড়ানো গেলে এলপিজির দাম কমানো সম্ভব হবে।
লোয়াবের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে দেশে ১ লাখ ৫৮ হাজার মেট্রিক টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। সেপ্টেম্বরে আমদানি হয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার টন। অর্থাৎ আমদানির পরিমাণ মোটামুটি স্বাভাবিক রয়েছে। এ কারণে সংগঠনটি ব্যবসায়ীদের নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি বিক্রি না করার আহ্বান জানিয়েছে।
সরবরাহ সংকটে ঢাকায় বেড়েছে দাম
বাজারসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত ২০ সেপ্টেম্বর থেকে কিছু কোম্পানি এলপিজির সরবরাহ কমাতে শুরু করে। প্রথম দিকে প্রায় ৩০ শতাংশ সরবরাহ কমানো হলেও পরে তা ৫০ শতাংশের বেশি হয়। এর প্রভাব পড়ে খুচরা বাজারে।
বিইআরসি নতুন দাম সমন্বয়ের পর সরবরাহ ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করেছে। তবে এলপিজি বহনকারী ট্রাকের দীর্ঘ সারি থাকায় বাজারে সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে এক সপ্তাহের বেশি সময় লাগতে পারে বলে ব্যবসায়ীদের ধারণা।
আজম জে চৌধুরীর ভাষ্য, পাইপলাইনের গ্যাসের সংকটের কারণে শিল্প খাতে এলপিজির চাহিদা বেড়েছে। ফলে আমদানি স্বাভাবিক থাকলেও আবাসিক বাজারে সরবরাহ কমে গেছে। আমদানি আরও বাড়ানো হচ্ছে এবং কয়েক দিনের মধ্যে সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে পারে।
ঢাকার বাইরে তুলনামূলক কম দামে এলপিজি
একই দেশে এলপিজির দাম নিয়ে আরেকটি বৈষম্যও দেখা যাচ্ছে। ঢাকার তুলনায় দেশের অন্যান্য এলাকায় অনেক কম দামে সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে।
বরিশাল শহরের বটতলা এলাকার একটি দোকানে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পেট্রম্যাক্স, সান ও ফ্রেশ ব্র্যান্ডের ১২ কেজির সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৮৭০ টাকায়। টোটাল গ্যাসের ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৯২০ টাকা। অর্থাৎ ঢাকার তুলনায় একই সিলিন্ডারে প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে রাজধানীর গ্রাহকদের।
ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেন, ২০২১ সালের আগে ব্যবসায়ীরা নিজেদের মতো করে এলপিজির দাম নির্ধারণ করতেন। পরে আদালতের আদেশে বিইআরসি দাম নির্ধারণের ক্ষমতা পায়।
তাঁর অভিযোগ, বিইআরসি আশপাশের দেশগুলোর তুলনায় বেশি দাম নির্ধারণ করছে। কিন্তু সেই দামও বাজারে কার্যকর করতে পারছে না। ফলে ভোক্তাদের নির্ধারিত দামের চেয়েও বেশি দামে এলপিজি কিনতে হচ্ছে।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশে এলপিজির দামের সমস্যা শুধু আমদানি ব্যয় বা আন্তর্জাতিক বাজারদরের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে পরিবহন ব্যয়, পর্যাপ্ত মজুত সক্ষমতার অভাব, গভীর সমুদ্রভিত্তিক অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা এবং বাজারে সরবরাহ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা। এসব কারণে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি কিনতে হচ্ছে ভোক্তাদের, বিশেষ করে রাজধানীর গ্রাহকদের।
