এদিকে ওষুধ, ইস্পাত, হিমাগার খাতের কিছু কারখানা বিকল্প জ্বালানি হিসেবে ডিজেল ব্যবহার করে সীমিত পরিসরে উৎপাদন চালু রেখেছে। এতে তাদের ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে।
গতকাল শনিবার নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, সাভার, গাজীপুর, চট্টগ্রাম, হবিগঞ্জ, ময়মনসিংহ ও খুলনা এলাকায় বিভিন্ন শিল্পকারখানার তথ্য নিয়েছে প্রথম আলো। দেশের বেশির ভাগ উৎপাদনমুখী বড় শিল্পকারখানা এসব এলাকায় অবস্থিত।
জানা গেছে, গ্যাস–সংকটের কারণে গত এক সপ্তাহে এসব অঞ্চলে ১০০টির বেশি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়েছে। এর মধ্যে বড় একটি অংশ নিত্যপণ্যের কারখানা। বন্ধ হওয়া কারখানার মধ্যে বড় শিল্পগোষ্ঠীর কারখানাই অর্ধশতাধিক। এ ছাড়া বন্ধ না হলেও উল্লেখযোগ্য হারে উৎপাদন কমেছে দেড় শতাধিক কারখানায়।
শিল্পমালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশে প্রায় এক মাস ধরে গ্যাসের বেশি সরবরাহ–সংকট রয়েছে। এর মধ্যে গত সপ্তাহে এই সংকট তীব্র হয়েছে। গ্যাসের চাপ কম থাকায় অনেক কারখানায় শ্রমিকদের কাজ বন্ধ রেখে বসে থাকতে হচ্ছে।
চাপ কিছুটা বাড়লেই আবার উৎপাদন শুরু করছে তারা। শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তারা বলছেন, গ্যাসের চাপ স্বাভাবিক না হলে উৎপাদন আরও ব্যাহত হতে পারে। যদিও গতকাল গ্যাসের সরবরাহ সামান্য বেড়েছে বলে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে।
নিত্যপণ্যের অর্ধশত কারখানা বন্ধ
নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রাম এলাকায় চিনি, গম, ভোজ্যতেল ও ডালসহ নিত্যপণ্য প্রক্রিয়াজাতের শতাধিক কারখানা রয়েছে। গ্যাস–সংকটের কারণে এর মধ্যে প্রায় অর্ধেক কারখানাই সাময়িকভাবে বন্ধ হয়েছে। যেগুলো চালু রয়েছে, তারাও সক্ষমতার চেয়ে অনেক কম উৎপাদন করতে পারছে।
দেশের অন্যতম শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠী মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের (এমজিআই) দুই-তৃতীয়াংশের বেশি কারখানায় উৎপাদন বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গতকাল বিকেল পর্যন্ত মেঘনা গ্রুপের মালিকানাধীন ৫৭টি কারখানার মধ্যে ৪০টির উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ ছিল। এর একটি বড় অংশ নিত্যপণ্যের। বাকি যে কারখানাগুলো চালু আছে, সেগুলোতে ছোটখাটো পণ্য বা স্বল্প পরিমাণে উৎপাদন হচ্ছে।
আরেক বড় শিল্পগোষ্ঠী টি কে গ্রুপের ২৮টি কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে বেশির ভাগ কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রয়েছে বলে জানিয়েছেন গ্রুপের পরিচালক মুহাম্মদ মোস্তফা হায়দার। তিনি জানান, ঢাকার আশপাশের গ্যাসনির্ভর কারখানাগুলোর মধ্যে মাত্র একটিতে সীমিত পরিসরে উৎপাদন চালু রয়েছে; বাকিগুলো একেবারে বন্ধ। বন্ধ কারখানাগুলোর বেশির ভাগই নিত্যপণ্যের।
দেশের উত্তরাঞ্চল এবং যশোর ও খুলনা অঞ্চলেও টি কে গ্রুপের বেশ কিছু কারখানা রয়েছে। এগুলো বিদ্যুৎনির্ভর। কিন্তু লোডশেডিংয়ের কারণে এগুলোর উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এসব স্থানে দিনে ৮ থেকে ১০ বার পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে বলে জানান মোস্তফা হায়দার।
দেশের আরেক শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠী এসিআই লিমিটেডের বিভিন্ন কারখানায় সামগ্রিক উৎপাদন কমেছে। ঢাকার আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় তাদের বেশ কয়েকটি কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে লবণ কারখানা, বন্দর এলাকায় আটা-ময়দা ও ওষুধ তৈরির কারখানা এবং গাজীপুরের কোনাবাড়ী ও টঙ্গীতে ন্যাপকিন, ডায়াপার, বিভিন্ন কৃষি উপকরণ, মোটরসাইকেল সংযোজন ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম তৈরি করে কোম্পানিটি। সব কারখানাতেই উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক নিচে নেমে গেছে।
প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা জানান, তাদের বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে কোথাও ৩০ শতাংশ, কোথাও ৫০ শতাংশ, কোথাও এর চেয়েও বেশি হারে উৎপাদন কমে গেছে। বিশেষ করে লবণ উৎপাদন বেশি ব্যাহত হচ্ছে।
এসিআই লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক কামরুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘একদিকে বিদ্যুতের সমস্যা ভোগাচ্ছে। আবার যেসব কারখানায় জেনারেটর দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হতো, গ্যাস না থাকায় এখন সেই জেনারেটরও চালানো সম্ভব হচ্ছে না। আবার গ্যাস না থাকায় বয়লারনির্ভর কারখানায় উৎপাদন একেবারেই কমে গেছে। সব মিলিয়ে আমাদের বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি মুখে পড়তে হচ্ছে।’
