সাত দলের মধ্যে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ সরাসরি জামায়াতের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক না রাখার প্রস্তাব দিয়েছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশও অন্য কোনো রাজনৈতিক পক্ষের সঙ্গে সমঝোতা না করার শর্ত দিয়েছে। আর বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন ও ইসলামী ঐক্যজোট ঐক্যের আদর্শিক ভিত্তি হিসেবে আহলে সুন্নাত ওয়াল জমা’য়াতের আকিদার কথা বলেছে।
অন্যদিকে খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস শুরুতেই জামায়াত বা অন্য কোনো রাজনৈতিক জোটের বিষয়ে শর্ত আরোপের পক্ষে নয়।
সাত দলের প্রস্তাব নিয়ে গত ১৫ আগস্ট ঢাকার খিলগাঁওয়ের মাখজানুল উলুম মাদ্রাসায় বৈঠক করে হেফাজতের গঠিত সাবকমিটি। এতে হেফাজতের আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী, মহাসচিব সাজিদুর রহমানসহ সংশ্লিষ্ট নেতারা অংশ নেন। তবে এখনো ঐক্যের চূড়ান্ত রূপরেখা তৈরি হয়নি।
হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব আজিজুল হক ইসলামাবাদী জানিয়েছেন, সাত দলের প্রস্তাবগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। পরবর্তী বৈঠকে ঐক্যের রূপরেখা চূড়ান্ত করার চেষ্টা করা হবে।
এর আগে ১৬ জুলাই চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির জামেয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদ্রাসায় হেফাজতের আমিরের সভাপতিত্বে সাতটি দলের নেতাদের নিয়ে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানেই দলগুলোকে ঐক্যের বিষয়ে লিখিত প্রস্তাব দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছিল।
জামায়াত প্রশ্নে দুই ধরনের অবস্থান
জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের প্রস্তাবে জামায়াতের সঙ্গে প্রস্তাবিত ঐক্যের কোনো সম্পর্ক না থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে সাত দলের কোনো কর্মসূচিতে জামায়াতের নেতাকর্মী এবং জামায়াতের কোনো কর্মসূচিতে সাত দলের নেতাকর্মীদের অংশ না নেওয়ার প্রস্তাবও দিয়েছে দলটি।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ সরাসরি জামায়াতের নাম উল্লেখ না করলেও অন্য কোনো রাজনৈতিক পক্ষের সঙ্গে সমঝোতা না করার শর্ত দিয়েছে। দলটির মতে, নতুন ঐক্যকে কার্যকর করতে হলে সংশ্লিষ্ট দলগুলোর রাজনৈতিক অবস্থানও স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন।
অন্যদিকে বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন ও ইসলামী ঐক্যজোট ঐক্যের আদর্শিক ভিত্তি হিসেবে আহলে সুন্নাত ওয়াল জমা’য়াতের আকিদাকে গুরুত্ব দিয়েছে। তাদের প্রস্তাবে ভিন্ন আকিদার রাজনৈতিক পক্ষের সঙ্গে ঐক্যের বিষয়ে আপত্তি জানানো হয়েছে।
তবে খেলাফত মজলিসের অবস্থান কিছুটা ভিন্ন। দলটির নেতারা মনে করছেন, হেফাজত যেহেতু নিজেদের অরাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে দাবি করে, তাই কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া তাদের জন্য উপযুক্ত হবে না। জামায়াতকে বাদ দেওয়াকে ঐক্যের পূর্বশর্ত করার বিষয়েও আপত্তি রয়েছে তাদের।
বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টিও শুরুতেই অন্য কোনো রাজনৈতিক জোটে থাকা বা না থাকার বিষয়ে শর্ত আরোপের বিপক্ষে। দলটির প্রস্তাব, প্রথমে কওমি ঘরানার দলগুলোর মধ্যে ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। পরে পরিস্থিতি ও রাজনৈতিক প্রয়োজন অনুযায়ী এর পরিধি বাড়ানো যেতে পারে।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসও কোনো পূর্বশর্ত ছাড়া ঐক্য গঠনের পক্ষে। দলটির মতে, যেসব বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য রয়েছে, সেগুলো নিয়ে একসঙ্গে কাজ করা উচিত। আর মতপার্থক্যের বিষয়গুলো ধীরে ধীরে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা যেতে পারে।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ জামায়াত প্রশ্ন?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কওমি ঘরানার দলগুলোর মধ্যে জামায়াতকে ঘিরে দীর্ঘদিনের আদর্শিক ও রাজনৈতিক বিরোধ রয়েছে। দেওবন্দ ধারার অনেক আলেম জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা সাইয়্যেদ আবুল আলা মওদূদীর ইসলামবিষয়ক কিছু ব্যাখ্যাকে বিতর্কিত মনে করেন। এ কারণে হেফাজতের শীর্ষ নেতাদের বিভিন্ন বক্তব্যেও জামায়াতের সমালোচনা এসেছে।
সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচনেও কওমি ঘরানার দলগুলো বিভিন্ন রাজনৈতিক জোটে বিভক্ত ছিল। জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বিএনপির সঙ্গে জোট করে নির্বাচন করে। অন্যদিকে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস ও বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যে অংশ নেয়।
বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন ওই জোটে থাকলেও আসন সমঝোতা না হওয়ায় এককভাবে নির্বাচন করে। ইসলামী আন্দোলনও নির্বাচনের আগে ১১-দলীয় ঐক্য থেকে বেরিয়ে এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেয়।
নির্বাচনের পর বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য ও অসন্তোষের কারণে ইসলামপন্থী দলগুলোর মধ্যে নতুন করে আলাদা ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।
এখন মূল প্রশ্ন
বিশ্লেষকদের মতে, হেফাজতের উদ্যোগে সাত দলের নতুন ঐক্য শেষ পর্যন্ত কতটা কার্যকর হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করছে জামায়াত প্রশ্নে সমঝোতার ওপর।
এই ঐক্য কি জামায়াত ও তাদের নেতৃত্বাধীন জোট থেকে পুরোপুরি দূরে থাকবে, নাকি প্রতিটি দলকে নিজস্ব রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা দেওয়া হবে—এখন সেটিই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
