কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার টৈটং ইউনিয়নের সোনাইছড়ি এলাকার বাসিন্দা জমির উদ্দিন। আনোয়ারা-বাঁশখালী-চকরিয়া (এবিসি) আঞ্চলিক মহাসড়ক থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে পাহাড়ঘেরা রমিজপাড়ায় তাঁর চার একরের মিশ্র ফলের বাগান।
প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কৃষির কোনো প্রশিক্ষণ নেই জমিরের। গাছের রোগবালাই, পরিচর্যা কিংবা নতুন চাষপদ্ধতি জানতে তাঁর প্রধান ভরসা ইউটিউব ও গুগল। প্রয়োজন হলে কৃষি কর্মকর্তাদের কাছ থেকেও পরামর্শ নেন তিনি।
২০২৩ সালে চার একর জমি লাগিয়ত নিয়ে মিশ্র ফলের বাগান শুরু করেন জমির। বর্তমানে সেখানে রয়েছে প্রায় ১ হাজার ৪০০টি পেয়ারা, ৭৮০টি বারি-১ মাল্টা, ২০টি বারোমাসি মাল্টা, ২৫০টি জাম্বুরা এবং ২৫০টি দার্জিলিং কমলার গাছ। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এসব গাছের চারা সংগ্রহ করেছেন তিনি।
জমি নেওয়া, জমি উন্নয়ন, চারা, শ্রমিক, সেচ, সার, কীটনাশক, বেড়া ও ফল প্যাকেটজাত করার উপকরণসহ দুই বছরে তাঁর খরচ হয়েছে প্রায় ৩২ লাখ টাকা। বাগানে প্রথম ফলন আসে গত বছর। ওই বছরই প্রায় ২২ লাখ টাকার ফল বিক্রি করেন তিনি।
এ বছরও ভালো ফলনের আশা করেছিলেন জমির। তবে জুলাইয়ের বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে তাঁর বাগান টানা ছয় দিন পানিতে ডুবে থাকে। এতে প্রায় ৩৫ হাজার পেয়ারা ও ১০ হাজার মাল্টা ঝরে পড়ে। মারা যায় প্রায় ৭০০টি ফলগাছ। সব মিলিয়ে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১০ লাখ টাকা।
তারপরও চলতি মৌসুমে প্রায় ১৭ লাখ টাকার ফল বিক্রির আশা করছেন তিনি। বর্তমানে কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের পাইকারেরা সরাসরি তাঁর বাগান থেকে ফল কিনে নিচ্ছেন। স্থানীয় বাজারে মাল্টা প্রতি কেজি ১২০ থেকে ১৫০ টাকা এবং পেয়ারা ৮০ থেকে ১০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
জমির উদ্দিন বলেন, ‘কঠোর পরিশ্রম আর পুঁজি খাটালে দেশে বসেই বিদেশের চেয়ে বেশি আয় করা সম্ভব। বন্যায় এ বছর ক্ষতি হয়েছে। তবে বাগান তো এক দিনের জন্য নয়। এ বছর আয় কম হলেও আগামী বছর তা পুষিয়ে নেওয়ার আশা করছি।’
প্রবাসজীবন শেষে কৃষিতে নতুন শুরু
ভাগ্য বদলানোর আশায় ২০০০ সালে সৌদি আরবে যান জমির উদ্দিন। প্রায় নয় বছর পর দেশে ফিরে প্রসাধনীর দোকান দেন। ব্যবসায় লোকসান হওয়ায় ২০১২ সালে আবার কাতারে যান। ২০১৬ সালে দেশে ফিরে সিএনজিচালিত অটোরিকশার ব্যবসা শুরু করেন। ভাড়ায় দেওয়ার জন্য পাঁচটি অটোরিকশা কিনলেও নানা সমস্যায় সেগুলো বিক্রি করে দিতে হয়।
এরপর কৃষির দিকে মনোযোগ দেন জমির। ২০১৮ সালে পাঁচ একর জমিতে পেঁপের বাগান করেন। এক বছর পর পেঁপে চাষে সুবিধা করতে না পেরে ২ হাজার ২৫০টি কলাগাছ লাগান। সেখান থেকে প্রায় আট লাখ টাকা লাভ হলেও পরের মৌসুমে ফলন কমে যায়। একপর্যায়ে কলাগাছ কেটে ফেলেন তিনি।
তবে কৃষি থেকে সরে যাননি। ২০২৩ সালে বাড়ির পাশে চার একর জমিতে শুরু করেন মিশ্র ফলের বাগান। একসঙ্গে বিভিন্ন ধরনের ফল চাষের কারণে কোনো একটি ফলের দাম কমে গেলেও অন্য ফল থেকে ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার সুযোগ থাকে।
কৃষির নতুন পদ্ধতি শেখার ক্ষেত্রেও প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করেন জমির। তিনি বলেন, ‘চীন, জাপানসহ বিভিন্ন দেশে কীভাবে আধুনিক পদ্ধতিতে বাগান করা হচ্ছে, ইউটিউবে তা দেখা যায়। সেখান থেকেই অনেক কিছু শিখেছি। কোনো সমস্যায় পড়লে কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শ নিই, পাশাপাশি গুগল ও ইউটিউবেও খোঁজ করি।’
পাহাড়ি এলাকায় মিশ্র ফলের সম্ভাবনা
পেকুয়ার পাহাড়ি এলাকায় মিশ্র ফলের বাগানের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তারা। তাঁদের মতে, এ অঞ্চলের মাটি মাল্টা, কমলা, কাজুবাদাম, কফি ও লেবু চাষের জন্য উপযোগী।
পেকুয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ফারুক হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘পেকুয়ায় বাণিজ্যিকভাবে মাল্টা চাষের বাগান হিসেবে জমির উদ্দিনের বাগানটি ব্যতিক্রম। পাহাড়ি এলাকায় এ ধরনের মিশ্র ফলের বাগানের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। কৃষি বিভাগ তাঁর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছে।’
বিদেশের মাটিতে দীর্ঘ সময় কাটিয়ে দেশে ফিরে নানা ব্যবসায় ব্যর্থ হলেও কৃষিতে এসে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন জমির উদ্দিন। ইউটিউব ও নিজের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে গড়ে তোলা তাঁর এই মিশ্র ফলের বাগান এখন শুধু আয়ের উৎস নয়, পাহাড়ি এলাকায় সম্ভাবনাময় কৃষিরও একটি উদাহরণ।
