ভারতীয় বাজারে ইলিশ রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হবে কি না, তা নির্ধারণে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মতামত চেয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে আবেদন পাওয়ার পর দেশে ইলিশের সরবরাহ ও চাহিদার বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে মতামত জানতে গতকাল বুধবার মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মতামত পাওয়ার পরই ভারতে ইলিশ রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হবে কি না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
গত বছর বাংলাদেশ সরকার ভারতে ১ হাজার ২০০ টন ইলিশ রপ্তানির অনুমতি দিয়েছিল। তবে অনুমোদিত পরিমাণের তুলনায় শেষ পর্যন্ত রপ্তানি হয়েছে মাত্র ১৫০ টন ইলিশ।
বাণিজ্যসচিব মো. আতাউর রহমান খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে মতামত পেলে শিগগির অনুমতির বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়া হবে। আশা করছি, রপ্তানির অনুমতি দেওয়ার পক্ষে ইতিবাচক মতামতই আসবে।’
এদিকে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকেরা এবার আগের বছরগুলোর মতো স্বল্প সময়ের জন্য নয়, বরং দীর্ঘ মেয়াদে ইলিশ রপ্তানির অনুমতি চেয়েছেন। তাঁদের দাবি, অন্তত দুই মাস এবং সম্ভব হলে সারা বছর ইলিশ রপ্তানির সুযোগ দেওয়া হোক।
রপ্তানিকারকদের যুক্তি, মাত্র ২০ থেকে ২৫ দিনের স্বল্প সময়ের মধ্যে ঋণপত্র বা এলসি খোলা, ইলিশ সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং প্যাকেজিংসহ রপ্তানির প্রয়োজনীয় সব কার্যক্রম সম্পন্ন করা কঠিন হয়ে পড়ে। এ কারণে তাঁরা এবার তুলনামূলকভাবে দীর্ঘ সময়ের জন্য রপ্তানির সুযোগ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
ইলিশ রপ্তানিতে আগ্রহী ১৮ প্রতিষ্ঠান
এ বছর ভারতে ইলিশ রপ্তানির অনুমতি চাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে খুলনার বিশ্বাস এন্টারপ্রাইজ। চট্টগ্রামের জেএস এন্টারপ্রাইজ ও আনরাজ ফিশ প্রোডাক্টসও রপ্তানির অনুমতি চেয়েছে।
এ ছাড়া যশোরের লাকি এন্টারপ্রাইজ, এমইউসি ফুডস, মোহতাব অ্যান্ড সন্স ও জনতা ফিশ রয়েছে আবেদনকারীদের তালিকায়। ঢাকার ভিজিল্যান্ট এক্সপ্রেস, স্বর্ণালী এন্টারপ্রাইজ, ম্যাজেস্টিক এন্টারপ্রাইজ ও বিডিএস করপোরেশনও ইলিশ রপ্তানির অনুমতি চেয়েছে।
বরিশালের মহিমা এন্টারপ্রাইজ, এআর এন্টারপ্রাইজ ও তানিশা এন্টারপ্রাইজ; ভোলার রাফিদ এন্টারপ্রাইজ এবং সাতক্ষীরার এম এ এন্টারপ্রাইজ ও সুমন ট্রেডার্সও এবার ভারতে ইলিশ রপ্তানির জন্য আবেদন করেছে।
বাংলাদেশ থেকে ইলিশ আমদানির অনুমতি চেয়েছে ভারত
বাংলাদেশ থেকে ইলিশ আমদানির অনুমতি চেয়েছে ভারতের ফিশ ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনটি সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে পৃথক চিঠি দিয়ে বাংলাদেশ থেকে ইলিশ আমদানির অনুমতি দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে।
সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে ইলিশ রপ্তানির অনুমতি দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে সংগঠনটি বলেছে, ১৯৯৬ সাল থেকে বাংলাদেশ প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৫ হাজার টন ইলিশ ভারতে রপ্তানি করত।
পরে বিভিন্ন সময়ে ইলিশ রপ্তানি অব্যাহত থাকলেও ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে দুর্গাপূজা উপলক্ষে সীমিত সময়ের জন্য বিশেষ অনুমতির মাধ্যমে আবারও বাংলাদেশ থেকে ভারতে ইলিশ রপ্তানি শুরু হয়।
অনুমোদনের তুলনায় বরাবরই কম রপ্তানি
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ভারতে ইলিশ রপ্তানির ক্ষেত্রে প্রতিবছরই অনুমোদিত পরিমাণের তুলনায় প্রকৃত রপ্তানির পরিমাণ কম ছিল।
দীর্ঘ বিরতির পর ২০১৯ সালে ৫০০ টন ইলিশ রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হয়। এরপর ২০২০ সালে অনুমোদন দেওয়া হয় ১ হাজার ৮৫০ টন ইলিশ রপ্তানির।
২০২১ সালে ৪ হাজার ৬০০ টন ইলিশ রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত ভারতে রপ্তানি হয় ১ হাজার ২০০ টন। ২০২২ সালে ২ হাজার ৯০০ টন রপ্তানির বিপরীতে ভারতে যায় ১ হাজার ৩০০ টন ইলিশ।
২০২৩ সালে ৩ হাজার ৯৫০ টন ইলিশ রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হলেও রপ্তানি হয় ১ হাজার ৩০০ টন। আর ২০২৪ সালে ২ হাজার ৪২০ টন ইলিশ রপ্তানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত ভারতে রপ্তানি করা হয় মাত্র ৫৭৭ টন ইলিশ।
এবার দুর্গাপূজাকে সামনে রেখে ১৮টি বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান ইলিশ রপ্তানির অনুমতি চাওয়ায় বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এখন দেশে ইলিশের সরবরাহ ও চাহিদা পরিস্থিতি বিবেচনা করে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মতামতের ভিত্তিতেই ভারতে ইলিশ রপ্তানির বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।
