বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সাময়িক নগদ সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি মানুষকে ডিজিটাল লেনদেনে আরও উৎসাহিত করাই এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। নতুন এই সুবিধার আওতায় যোগ্য গ্রাহকেরা সর্বনিম্ন ৫০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত স্বল্পমেয়াদি ঋণ নিতে পারবেন। তবে ঋণের অর্থ নগদ হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না; নির্ধারিত ডিজিটাল লেনদেনের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পেমেন্ট পরিশোধেই তা ব্যবহার করতে হবে।
‘ই-পেমেন্ট ক্রেডিট’ সুবিধার আওতায় বিদ্যুৎ, গ্যাসসহ বিভিন্ন ধরনের ইউটিলিটি বিল পরিশোধ করা যাবে। এর পাশাপাশি মোবাইল রিচার্জ, শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যয়, ভ্রমণ খরচ, কর ও সরকারি সেবার ফি, ঋণ বা আমানতের কিস্তি এবং বিমার প্রিমিয়াম পরিশোধেও এই ঋণ ব্যবহার করার সুযোগ থাকবে।
প্রাথমিক পর্যায়ে ব্যাংকগুলো অন্তত ছয় মাস পরীক্ষামূলকভাবে বা পাইলট ভিত্তিতে এ কার্যক্রম পরিচালনা করবে। পাইলট প্রকল্পের ফলাফল পর্যালোচনার পর সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন নিয়ে বাণিজ্যিকভাবে এই ঋণসেবা চালুর ব্যবস্থা করা হবে।
তবে এই ঋণের অর্থ কোনোভাবেই নগদে উত্তোলন করা যাবে না। এমনকি গ্রাহকের নিজস্ব ব্যাংক হিসাবে অর্থ স্থানান্তর কিংবা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস বা এমএফএস ওয়ালেটেও জমা করা যাবে না। অনুমোদিত ঋণের অর্থ নির্ধারিত ডিজিটাল পেমেন্ট চ্যানেলের মাধ্যমে সরাসরি সংশ্লিষ্ট বিলদাতা বা সেবাদাতার কাছে পরিশোধ করতে হবে।
ঋণ পরিশোধের জন্য গ্রাহকেরা ৭, ১৫ ও ৩০ দিনের মেয়াদ পাবেন। এ ঋণের ক্ষেত্রে প্রচলিত সুদের পরিবর্তে ব্যাংক নির্ধারিত সেবা ফি নেওয়া হবে।
৫০ টাকা থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত ঋণের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সেবা ফি নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ দিনের জন্য ৩ টাকা, ১৫ দিনের জন্য ৪ টাকা এবং ৩০ দিনের জন্য ৬ টাকা।
অন্যদিকে, ৭ হাজার ১ টাকা থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণের ক্ষেত্রে ৭ দিনের জন্য সর্বোচ্চ ৩৫ টাকা, ১৫ দিনের জন্য ৭০ টাকা এবং ৩০ দিনের জন্য ১৩০ টাকা সেবা ফি নেওয়া যাবে।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ঋণের অর্থ পরিশোধ করলে গ্রাহকের কাছ থেকে অতিরিক্ত কোনো সুদ নেওয়া যাবে না। একইভাবে, নির্ধারিত সময়ের আগে ঋণ পরিশোধ করলেও কোনো অতিরিক্ত বা আগাম পরিশোধ ফি দিতে হবে না। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ঋণ পরিশোধ না করলে গ্রাহকের ওপর জরিমানা আরোপ করা যেতে পারে। এ জরিমানার পরিমাণ সংশ্লিষ্ট ঋণের জন্য প্রযোজ্য দৈনিক সেবা ফির বেশি হতে পারবে না।
নতুন এই ব্যবস্থা পরিচালনার ক্ষেত্রে গ্রাহক নিবন্ধন থেকে শুরু করে ঋণের অনুমোদন, অর্থ পরিশোধ এবং ঋণ ফেরত নেওয়া—পুরো প্রক্রিয়াই ডিজিটাল পদ্ধতিতে সম্পন্ন করতে হবে। ফলে গ্রাহককে ঋণ নেওয়ার জন্য সরাসরি ব্যাংক শাখায় যাওয়ার প্রয়োজন হবে না।
লেনদেনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যাংকগুলোকে এককালীন পাসওয়ার্ড বা ওটিপি, দুই স্তরের নিরাপত্তা যাচাই কিংবা একাধিক স্তরের নিরাপত্তা যাচাইয়ের মতো নিরাপদ পদ্ধতি ব্যবহার করতে হবে। এর মাধ্যমে ডিজিটাল ঋণ ব্যবস্থায় গ্রাহকের তথ্য ও অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এই সুবিধা পরিচালনার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান, পেমেন্ট সেবা প্রদানকারী এবং ফিনটেক বা আর্থিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে অংশীদারত্ব করতে পারবে। এর ফলে ব্যাংকের নিজস্ব ডিজিটাল অবকাঠামোর পাশাপাশি অন্যান্য অনুমোদিত প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মও এই সেবার সঙ্গে যুক্ত হতে পারবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ শ্রেণীকরণ, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, গ্রাহক সুরক্ষা, অর্থপাচার প্রতিরোধ এবং তথ্যনিরাপত্তা–সংক্রান্ত বিদ্যমান নিয়মকানুনের আওতাতেই পরিচালিত হবে ‘ই-পেমেন্ট ক্রেডিট’ ব্যবস্থা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আশা, নতুন এই সুবিধা চালু হলে দেশে ডিজিটাল পেমেন্টের ব্যবহার আরও বাড়বে। একই সঙ্গে হঠাৎ প্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে সমস্যায় পড়া গ্রাহকেরা সহজেই ছোট অঙ্কের স্বল্পমেয়াদি ঋণ পাওয়ার সুযোগ পাবেন। ফলে নগদ অর্থের ওপর নির্ভরতা কমার পাশাপাশি ব্যাংকিং ব্যবস্থার সঙ্গে মানুষের ডিজিটাল সম্পৃক্ততাও আরও বাড়বে।
