এরই মধ্যে উত্তেজনাকর এই পরিস্থিতির মধ্যেই নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগ আগামী তিন মাসের জন্য ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার ২৮ সদস্যের নতুন আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করেছে। কমিটিতে আহ্বায়ক করা হয়েছে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের সাবেক শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান হাফিজকে।
মূলত শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) দিনব্যাপী ক্যাম্পাসে উত্তেজনা ও সংঘর্ষের পরিস্থিতির মধ্যেই রাতে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়লী আসিফ ইনান স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ইবি শাখার এ আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়।
প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, নতুন আহ্বায়ক কমিটির মেয়াদ শেষে সাংগঠনিক কার্যক্রম এবং রাজনৈতিক সক্রিয়তা বিবেচনা করে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হবে।
কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন—যুগ্ম আহ্বায়ক মো. মামুন-অর-রশিদ, আলী শ্রাবণ, তরিকুল ইসলাম তরুণ, রতন কুমার রায়, সামিউল ইসলাম, শাহিন আলম, মামুন রানা, সাব্বির আহমেদ আকিফ, রাব্বি হোসেন, নাছিম হাসান নাঈম, রাসেল আলী, রাকিবুল ইসলাম, সোহানুর রহমান, মেসবাহুল ইসলাম, নাবিল আহমেদ ইমন, মো. সাদিদ খান সাদি, হুসাইন তুষার, অনিক কুমার, সোহাগ শেখ, তানভীর হাসান, রাব্বি হাসান, আকিব মাসুদ, পিয়াস মুস্তাকিম, সাগর আহম্মেদ, মো. রাকিব হোসেন, শাহরিয়ার হিমেল ও পাভেল মোল্লা।
এদিকে ক্যাম্পাস সূত্রে জানা যায়, শনিবার দুপুর পৌনে ২টার দিকে পরীক্ষা শেষে হলে খাবার খেতে আসেন কাজী জুহায়ের। তিনি হলের গেট পেরিয়ে করিডোরে পৌঁছালে অভিযুক্ত আলীনূর হঠাৎ সেখানে এসে জুহায়েরকে চড় মারেন এবং গালিগালাজ করেন বলে অভিযোগ ওঠে।
এ সময় অন্য শিক্ষার্থীরা এগিয়ে এসে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন। তবে অভিযোগ রয়েছে, আলীনূর তাদের সঙ্গেও খারাপ আচরণ করেন। পরে তিনি হলের ২১৭ নম্বর কক্ষে চলে যান। এ ঘটনার একটি সিসিটিভি ফুটেজও প্রকাশ্যে এসেছে।
ঘটনার পরপরই শিবিরের নেতাকর্মীরা ঘটনাস্থলে এসে উত্তেজিত হয়ে অভিযুক্ত আলীনূরের কক্ষ ভাঙচুরের চেষ্টা করেন। এ সময় তারা কক্ষটির জানালার কাচ ভাঙচুর করেন। পরে প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে শিবিরের নেতাকর্মীদের সেখান থেকে সরিয়ে দেন।
এরপর প্রক্টরিয়াল বডি ও পুলিশ প্রশাসনের সহায়তায় অভিযুক্ত আলীনূরকে হল থেকে উদ্ধার করে প্রক্টর অফিসে নিয়ে যাওয়া হয়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসের পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
একই দিন বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে শাখা ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা ক্যাম্পাসের প্রধান ফটকে তালা দিয়ে লাঠিসোটা নিয়ে বিক্ষোভ করেন। অন্যদিকে, জিয়া মোড় এলাকায় লাঠিসোটা নিয়ে অবস্থান নেন শিবিরের নেতাকর্মীরা। এতে ক্যাম্পাসে উত্তেজনা আরও ছড়িয়ে পড়ে।
পরে বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে কুষ্টিয়া-খুলনা মহাসড়ক অবরোধ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে অবস্থান নেন ছাত্রদল ও বহিরাগত বিএনপির নেতাকর্মীরা। এ সময় তাদের কয়েকজনের হাতে দেশীয় অস্ত্র হিসেবে রামদা, ছুরি ও হাতুড়ি দেখা যায় বলে জানা গেছে।
একপর্যায়ে সেখানে স্থানীয় জামায়াত নেতাকর্মীদের সঙ্গে বিএনপি-ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পরে ক্যাম্পাসে অতিরিক্ত পুলিশ ও র্যাব সদস্য মোতায়েন করা হয়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার পাশাপাশি ঘটনার বিষয়ে উভয় পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করতে প্রক্টর অফিসে বৈঠকে বসে প্রক্টরিয়াল বডি। বৈঠকে ঘটনার কারণ অনুসন্ধান এবং দায়ীদের চিহ্নিত করতে তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এরই ধারাবাহিকতায় শহীদ জিয়াউর রহমান হলের দুই শিক্ষার্থীর মধ্যে সংঘটিত ঘটনাটি তদন্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর রহমান তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন।
সংঘর্ষ ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতির বিষয়ে কুষ্টিয়া জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) ফয়সল মাহমুদ বলেন, একটি ইস্যুকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় এবং ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার মতো ঘটনা ঘটে। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে উভয় পক্ষের সঙ্গে কথা বলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পাশাপাশি ক্যাম্পাসে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও পরবর্তী সময়ে যেন নতুন করে কোনো ধরনের উত্তেজনা তৈরি না হয়, সে জন্য পুলিশ সদস্যরা ক্যাম্পাসে অবস্থান করছেন।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর রহমান বলেন, ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে কমিটিকে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপাচার্য আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ স্বাভাবিক রাখতে বহিরাগতদের প্রবেশের বিষয়ে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা যাতে ক্যাম্পাসের পরিবেশকে অস্থিতিশীল করতে না পারে, সে বিষয়েও প্রশাসন সতর্ক থাকবে।
