অনেকেই নিজেদের পছন্দের প্রম্পট বা নির্দেশনা অন্যদের সঙ্গে শেয়ার করে তাঁদেরও এই ট্রেন্ডে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন। তৈরি করা ছবিগুলো দেখলে মনে হচ্ছে, সেগুলো যেন সত্যিই প্রায় ৪০ বছর আগে কোনো অ্যানালগ ক্যামেরায় তোলা হয়েছিল। একেকটি ছবিতে ফুটে উঠছে একেক ধরনের লুক ও পরিবেশ। কোনো কোনো ছবি মনে করিয়ে দিচ্ছে পুরোনো দিনের হলিউড কিংবা বলিউড স্টুডিও পোর্ট্রেটের কথা। আবার কিছু ছবি দেখতে অনেকটা পুরোনো ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদ, পারিবারিক অ্যালবাম কিংবা আশির দশকের ফ্যাশন ফটোগ্রাফির মতো।
যে ধরনের ছবি দেখা যাচ্ছে
আশির দশকের আবহ ফুটিয়ে তুলতে তৈরি করা ছবিগুলোতে সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে উষ্ণ আলো, উজ্জ্বল রং, সফট ফোকাস এবং পুরোনো ফিল্মের মতো গ্রেইনযুক্ত টেক্সচার। ছবিগুলোতে ব্যবহার করা হচ্ছে সেই সময়ের জনপ্রিয় পোশাক, চুলের স্টাইল, গহনা ও ব্যাকগ্রাউন্ড। নারীদের ক্ষেত্রে আশির দশকের রঙিন শাড়ি, বড় ও কোঁকড়ানো চুল এবং পোশাকের সঙ্গে মানানসই গহনার ব্যবহার চোখে পড়ছে।
অন্যদিকে পুরুষদের ছবিতে দেখা যাচ্ছে আশির দশকের স্টাইলের শার্ট, হাই-ওয়েস্টেড ট্রাউজার, গোঁফ এবং পরিপাটি করে সাজানো চুল। পাশাপাশি ছবির আলো, ক্যামেরার অ্যাঙ্গেল, রঙের ধরন এবং ফিল্ম গ্রেইনের মাধ্যমে পুরোনো দিনের ফটোগ্রাফির অনুভূতি তৈরি করা হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মেঘলা আলম শাড়ি পরে আশির দশকের স্টাইলে ছবি প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, এ ধরনের এআই ট্রেন্ড পুরোনো সোনালি দিনগুলোকে যেন চোখের সামনে ফিরিয়ে আনে এবং তৈরি করে এক ধরনের নস্টালজিয়া। প্রযুক্তির মাধ্যমে বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে অতীতের একটি যুগকে নতুন করে অনুভব করার বিষয়টি তাঁর কাছে বেশ আকর্ষণীয় বলে জানান তিনি।
তরুণ শিক্ষার্থী তসলিমা খান ঊষাও লাল ব্লাউজ ও শাড়ি পরা আশির দশকের স্টাইলের ছবি প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, বর্তমান প্রজন্মের কাছে এই ভিন্টেজ লুক অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও ফ্যাশনেবল একটি অভিজ্ঞতা। তাঁর বন্ধুরাও বেশ আগ্রহ নিয়ে এ ধরনের ছবি তৈরি ও শেয়ার করছেন। তাঁর মতে, এ ধরনের ছবি তৈরির জন্য খুব বেশি কারিগরি জ্ঞানের প্রয়োজন হয় না। শুধু সঠিক নির্দেশনা বা প্রম্পট ব্যবহার করলেই সহজে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাচ্ছে।
পেশাজীবী ও জনস্বাস্থ্যবিষয়ক গবেষক ইরফাত জেবীন নিজের দাম্পত্যসঙ্গীর সঙ্গে আশির দশকের স্টাইলে ছবি তৈরি করেছেন। তিনি জানান, ছবিগুলোতে বিভিন্ন যুগলের পুরোনো দিনের সাজপোশাক দেখতে বেশ চমৎকার ও আনন্দদায়ক লাগছে। নিজের তৈরি ছবির ক্ষেত্রে তিনি সিডনি, মেলবোর্ন ও ঢাকার বিভিন্ন লোকেশন ব্যবহার করেছেন বলেও জানান।
পেশাজীবী লুৎফুন নাহারও নিজের দাম্পত্যসঙ্গীর সঙ্গে আশির দশকের স্টাইলে ড্রইংরুমে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ছবি প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, এ ধরনের ডিজিটাল রূপান্তর পুরোনো স্মৃতির সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হওয়ার একটি দারুণ সুযোগ। বাস্তবে যে সময়টিকে অনেকে দেখেননি, প্রযুক্তির মাধ্যমে সেই সময়ের পোশাক, সাজসজ্জা ও পরিবেশকে নিজেদের ছবিতে ফুটিয়ে তোলা যাচ্ছে।
অন্যদিকে একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা ফাহিমা আহমেদ ১৯৮০ দশকের আরবান স্টাইলে ছবি প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, সেকালের শহুরে ফ্যাশন এবং আধুনিক প্রযুক্তির এই মেলবন্ধন বেশ উপভোগ্য। পুরোনো দিনের ফ্যাশন ও বর্তমান সময়ের এআই প্রযুক্তি একসঙ্গে ব্যবহার করে ভিন্ন ধরনের ভিজ্যুয়াল তৈরি করা যাচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
আশির দশকের ছবি বানাবেন যেভাবে
চ্যাটজিপিটির মাধ্যমে এ ধরনের ছবি তৈরি করার পদ্ধতিও বেশ সহজ। প্রথমে নিজের পছন্দের একটি ছবি চ্যাটজিপিটিতে আপলোড করতে হবে। এরপর ছবিটিকে আশির দশকের আদলে রূপান্তর করার জন্য নির্দিষ্ট নির্দেশনা দিতে হবে। চুলের ধরন, পোশাক, গহনা, পটভূমি, আলো, ক্যামেরার ধরন এবং ছবির রঙ—এসব বিষয়ে যত নির্দিষ্টভাবে নির্দেশনা দেওয়া যাবে, কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়ার সম্ভাবনাও তত বাড়বে।
এ ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীরা চাইলে পুরোনো বলিউড স্টুডিও পোর্ট্রেট, আশির দশকের পারিবারিক অ্যালবাম, ম্যাগাজিন কভার কিংবা সে সময়ের গ্ল্যামারাস ফ্যাশন ফটোগ্রাফির মতো নির্দিষ্ট কোনো ভিজ্যুয়াল স্টাইলও বেছে নিতে পারেন।
চ্যাটজিপিতে বাংলার পাশাপাশি ইংরেজিতেও নির্দেশনা দেওয়া যায়। যেমন, ক্ল্যাসিক বলিউড পোর্ট্রেটের জন্য এমন নির্দেশনা দেওয়া যেতে পারে—
‘এই ছবিটিকে আশির দশকের একটি খাঁটি বলিউড স্টুডিও পোর্ট্রেটে রূপান্তর করুন। আমার মুখের বৈশিষ্ট্য এবং পরিচয় যেন স্পষ্টভাবে চেনা যায়। আমাকে আশির দশকের উপযোগী পোশাক, চুলের স্টাইল এবং অলংকার দিন। এর সঙ্গে উষ্ণ স্টুডিও লাইটিং, সফট ফোকাস, হালকা ফিল্ম গ্রেইন এবং কিছুটা বিবর্ণ রং ব্যবহার করুন। এটি দেখে যেন মনে হয় আশির দশকে তোলা একটি আসল ছবি।’
অন্যদিকে পুরোনো পারিবারিক অ্যালবামের আবহ তৈরি করতে নির্দেশনা দেওয়া যেতে পারে—
‘এই ছবিটি এমনভাবে তৈরি করুন যেন এটি আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে কোনো বাংলাদেশি পারিবারিক ফটো অ্যালবামে তোলা হয়েছিল। ব্যক্তির মুখ ও অভিব্যক্তি প্রাকৃতিক রাখুন। সাধারণ ইনডোর সেটিং, অ্যানালগ ক্যামেরার টেক্সচার, হালকা গ্রেইন, নরম আলো এবং বাস্তবসম্মত ফিল্মের রঙের সঙ্গে মানানসই পোশাক, চুলের স্টাইল ও পটভূমি যুক্ত করুন।’
আবার কেউ যদি আশির দশকের বলিউড বা হলিউডের নায়িকা স্টাইলের ছবি তৈরি করতে চান, তাহলে ব্যবহার করতে পারেন এমন নির্দেশনা—
‘এই ছবিটিকে আশির দশকের একজন গ্ল্যামারাস বলিউড নায়িকার পোর্ট্রেটে পরিণত করুন। আমার মুখ চেনা যায় এমন ও স্বাভাবিক রাখুন। আশির দশকের ভলিউমযুক্ত স্টাইলে চুল সাজান, একটি রঙিন শাড়ি এবং আকর্ষণীয় গয়না দিন। আমাকে একটি ক্ল্যাসিক স্টুডিওর পটভূমিতে স্থাপন করুন। উষ্ণ আলো, সফট ফোকাস এবং অ্যানালগ ফিল্ম গ্রেইন ব্যবহার করুন।’
ব্যক্তিগত গোপনীয়তার ক্ষেত্রে ঝুঁকি
তবে এআই দিয়ে এ ধরনের ছবি তৈরির জনপ্রিয়তার পাশাপাশি ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও তথ্যনিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মিডিয়া, কমিউনিকেশনস ও জার্নালিজম বিভাগের শিক্ষক শরিফুল ইসলাম মনে করেন, এ ধরনের ট্রেন্ডে কিছুটা গোপনীয়তার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
তিনি জানান, এই ট্রেন্ড মূলত নস্টালজিয়া ও ভিজ্যুয়াল নোভেলটির একটি নিখুঁত মিশ্রণ। মানুষ নিজের পরিচিত সময় ও পরিবেশের বাইরে গিয়ে ভিন্ন একটি যুগে নিজেকে দেখতে পছন্দ করে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রযুক্তি সহজলভ্য হয়ে যাওয়ার কারণেই এ ধরনের ট্রেন্ড খুব দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে।
তাঁর মতে, এটি শুধু বিনোদনের একটি মাধ্যম নয়; একই সঙ্গে পুরোনো সংস্কৃতি, ফ্যাশন ও জীবনধারার প্রতি তরুণ প্রজন্মের নতুন করে আগ্রহের বহিঃপ্রকাশও দেখা যাচ্ছে। ঐতিহ্য ও আধুনিক প্রযুক্তির এমন সৃজনশীল ব্যবহার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইতিবাচক এক ধরনের আগ্রহ তৈরি করেছে।
তবে এর পাশাপাশি ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কারণ, এসব ট্রেন্ডের মাধ্যমে বিভিন্ন এআই মডেলে বিপুলসংখ্যক ব্যবহারকারী তাঁদের ব্যক্তিগত ছবি ও অন্যান্য তথ্য আপলোড করছেন। ফলে এসব তথ্য কীভাবে সংরক্ষণ, ব্যবহার বা প্রক্রিয়াজাত করা হচ্ছে—তা নিয়ে সচেতন থাকা জরুরি। ব্যক্তিগত ছবি এআই প্ল্যাটফর্মে ব্যবহারের ক্ষেত্রে গোপনীয়তা নীতিমালা ও তথ্য ব্যবহারের শর্তগুলো যাচাই করে নেওয়ার পরামর্শও গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে, আশির দশকের এই এআই ছবি তৈরির ট্রেন্ড প্রযুক্তির মাধ্যমে অতীতকে নতুন করে দেখার একটি মজার ও সৃজনশীল সুযোগ তৈরি করেছে। পুরোনো দিনের ফ্যাশন, সাজসজ্জা ও ফটোগ্রাফির আবহকে নিজেদের ছবিতে ফিরিয়ে এনে অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নস্টালজিয়ার নতুন অভিজ্ঞতা তৈরি করছেন। তবে বিনোদনের পাশাপাশি ব্যক্তিগত তথ্য ও ছবির নিরাপত্তার বিষয়টিও মাথায় রেখে এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করাই হবে সচেতনতার পরিচয়।
