নতুন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গত শুক্রবার সন্ধ্যায় বঙ্গভবনের দরবার হলে শপথ নিয়েছেন। এরপর আজ রোববার তিনি উঠছেন ঐতিহাসিক এই ভবনে।
বঙ্গভবনের ইতিহাসের শুরু ১৯০৫ সালে। সে সময় ব্রিটিশ সরকার বঙ্গভঙ্গ ঘোষণা করে পূর্ববঙ্গ ও আসাম নামে নতুন একটি প্রদেশ গঠন করে। ঢাকাকে করা হয় প্রদেশটির রাজধানী। নতুন প্রদেশের লেফটেন্যান্ট গভর্নরের জন্য প্রয়োজন ছিল একটি সরকারি বাসভবন। সেই প্রয়োজন থেকেই ঢাকার দিলখুশা এলাকায় বঙ্গভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
নবগঠিত পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশের প্রথম লেফটেন্যান্ট গভর্নর ছিলেন স্যার জোসেফ ব্যামফিল্ড ফুলার। তাঁর জন্যই দানা দিঘীর ময়দানে শুরু হয় নতুন বাসভবন নির্মাণের কাজ। ১৯০৫ সালে নির্মাণ শুরু হয়ে ভবনটি পুরোপুরি শেষ হয় ১৯১১ সালে। তবে ১৯০৬ সালেই সেখানে ওঠেন লেফটেন্যান্ট গভর্নর ফুলার।
ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, বঙ্গভবনের বর্তমান জায়গাটি একসময় ঢাকার নবাব পরিবারের সম্পত্তি ছিল। নবাব স্যার সলিমুল্লাহ তাঁদের দিলখুশার পারিবারিক বাগানের দক্ষিণ অংশ ব্রিটিশ সরকারের কাছে ইজারা দেন। সেখানেই গড়ে ওঠে সরকারি বাসভবন।
শুরুতে ভবনটির নাম ছিল ‘গভর্নমেন্ট হাউজ’। সেগুন কাঠ দিয়ে তৈরি ভবনটির মেঝে ছিল মাটি থেকে প্রায় চার ফুট উঁচু। কাঠের এই স্থাপনাকে সে সময় বলা হতো ‘টিম্বার প্যালেস’, অর্থাৎ কাঠের রাজপ্রাসাদ।
তবে ১৯৬১ সালের একটি ঘূর্ণিঝড়ে কাঠের ভবনটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর নতুন করে ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। লাহোর থেকে আনা স্থপতি মঈনুদ্দিন চিশতীর নকশায় নির্মিত হয় নতুন ভবন। ইসলামিক স্থাপত্যশৈলীর প্রভাব থাকা দুইতলা এই ভবনের নির্মাণকাজ শেষ হয় ১৯৬৪ সালের ১৭ জানুয়ারি।
নতুন ভবনে যুক্ত হয় দরবার হল, দপ্তর, শোবার ঘরসহ বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক কক্ষ। পাকিস্তান আমলে এটি ছিল গভর্নরের বাসভবন। বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানও এখানে অনুষ্ঠিত হতো।
মুক্তিযুদ্ধের সময় ১৯৭১ সালে বিমান হামলায় ভবনটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্বাধীনতার পর আবারও সংস্কার করা হয় বঙ্গভবনকে।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার মাত্র কয়েক দিন পর, ২৩ ডিসেম্বর ১৯৭১, এই ভবনেই স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এরপর ভবনটিকে রাষ্ট্রপতির সরকারি বাসভবন ও দপ্তর হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং নাম দেওয়া হয় ‘বঙ্গভবন’।
সময়ের সঙ্গে বঙ্গভবনে যুক্ত হয়েছে নতুন নতুন কক্ষ ও স্থাপনা। দেশের খ্যাতিমান শিল্পীদের বিভিন্ন চিত্রকর্ম দিয়ে সাজানো হয়েছে এর অভ্যন্তর।
অর্থাৎ, ব্রিটিশ আমলের ‘গভর্নমেন্ট হাউজ’ থেকে আজকের বঙ্গভবন—একটি স্থাপনার ইতিহাসের সঙ্গে মিশে আছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় ইতিহাসের দীর্ঘ পথচলা।
