১৩ বছর পর সেই ঘটনার দিকে ফিরে তাকানোর কারণ অন্য। কারণ, ২০১৩ সালের বিএনপি আর ২০২৬ সালের বিএনপি এক জায়গায় নেই। তারেক রহমান এখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। অন্যদিকে শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন।
তাই প্রশ্ন শুধু তারেক রহমান ভারত সফরে যাবেন কি না—তা নয়। বড় প্রশ্ন হলো, পরিবর্তিত এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক কোন পথে যাবে এবং নতুন সরকার কীভাবে সেই সম্পর্ক পরিচালনা করবে।
ঢাকার তাড়াহুড়া নেই, দিল্লির আগ্রহ কেন?
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বলছে, ঢাকা ও দিল্লি—দুই পক্ষই সম্পর্ক এগিয়ে নিতে আগ্রহী। তবে সম্পর্কের শর্ত ও অগ্রাধিকার নিয়ে চলছে হিসাব-নিকাশ।
ঢাকার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ভারতের সঙ্গে ভালো ও কার্যকর সম্পর্ক প্রয়োজন। তবে সেই সম্পর্ক হতে হবে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে।
অন্যদিকে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করও বলেছেন, প্রতিবেশীদের শুধু ভারতের স্বার্থ বিবেচনা করলেই হবে না; ভারতকেও তাদের স্বার্থ বুঝতে হবে। অর্থাৎ দুই দেশের সম্পর্ক টেকসই করতে হলে পারস্পরিক স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য প্রয়োজন।
তাহলে বর্তমান বাস্তবতা দাঁড়াচ্ছে—সম্পর্ক থাকবে কি না, সেটি এখন মূল প্রশ্ন নয়। বরং প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কী চায়, ভারত কী চায় এবং দুই দেশের স্বার্থ কোথায় গিয়ে এক জায়গায় মেলে।
বাংলাদেশের হাতে কি এখন বেশি বিকল্প?
আগের তুলনায় বাংলাদেশের সামনে এখন পররাষ্ট্রনীতিতে বেশ কিছু বিকল্প তৈরি হয়েছে।
চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য, অবকাঠামো ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ছে। সৌদি আরব গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার ও অর্থনৈতিক অংশীদার। তুরস্কের সঙ্গে বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতার সুযোগ তৈরি হয়েছে। পাকিস্তানের সঙ্গেও দীর্ঘ বিরতির পর যোগাযোগ বাড়ছে।
একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গেও বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে।
এই নীতিকে অনেক বিশ্লেষক ‘মাল্টি-অ্যালাইনমেন্ট’ বা বহুমুখী সম্পর্কের কৌশল হিসেবে দেখছেন। অর্থাৎ কোনো একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর না করে একাধিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক রেখে নিজের স্বার্থ নিশ্চিত করা।
তবে এখানেও ঝুঁকি আছে। এক নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে এসে যদি অন্য কোনো দেশের ওপর নতুন নির্ভরতা তৈরি হয়, তাহলে কৌশলগত স্বাধীনতা আবারও সংকুচিত হতে পারে।
ভারতকে কি বাংলাদেশ এড়িয়ে যেতে পারবে?
বাংলাদেশের বিকল্প বেড়েছে—কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে ভারত অপ্রয়োজনীয় হয়ে গেছে।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানই দুই দেশকে গভীরভাবে পরস্পরনির্ভরশীল করে রেখেছে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পাশে বাংলাদেশ, দুই দেশের দীর্ঘ সীমান্ত এবং বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান—সব মিলিয়ে যোগাযোগ, বাণিজ্য, নদী, জ্বালানি ও নিরাপত্তায় দুই দেশের স্বার্থ জড়িয়ে আছে।
চীন বাংলাদেশের বড় অর্থনৈতিক অংশীদার হতে পারে, কিন্তু তিস্তার উজানে চীন নেই। সৌদি আরব বড় শ্রমবাজার হতে পারে, কিন্তু বাংলাদেশের প্রতিবেশী নয়। তুরস্ক প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হতে পারে, কিন্তু বাংলাদেশের নদী ও সীমান্তের প্রশ্নে তার সরাসরি ভূমিকা নেই।
তাই বাস্তবতা হলো—বাংলাদেশের বিকল্প বেড়েছে, কিন্তু ভারতকে বাদ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়নি। একইভাবে দিল্লির জন্যও বাংলাদেশের আর কোনো বিকল্প নেই—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়।
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ: সবচেয়ে কঠিন ইস্যু
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয়গুলোর একটি এখন শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ।
এটি শুধু দুই দেশের কূটনৈতিক বিরোধ নয়। এর সঙ্গে জুলাই-আগস্টের আন্দোলন, হত্যাকাণ্ড, বিচার ও জবাবদিহির প্রশ্ন জড়িত। ফলে বিষয়টিকে শুধুই কূটনৈতিক দর-কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে দেখলে এর গুরুত্ব কমিয়ে দেখা হবে।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার বিষয়ে ভারতের কাছে অনুরোধ জানিয়েছে। ঢাকা বলছে, বিষয়টি বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশা ও অনুভূতির সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত।
অন্যদিকে দিল্লির পক্ষ থেকে এ বিষয়ে প্রকাশ্যে খুব বেশি কিছু বলা হয়নি।
এখানে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—একদিকে শেখ হাসিনার বিচার ও প্রত্যর্পণের দাবি অব্যাহত রাখা, অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় ও প্রয়োজনীয় যোগাযোগ সচল রাখা।
কারণ, শুধু শেখ হাসিনা ইস্যুকে কেন্দ্র করে সম্পর্ক স্থবির হয়ে গেলে তিস্তা, গঙ্গা, সীমান্ত, বাণিজ্য, ভিসা, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দেওয়া কতটা নিরাপদ?
তারেক রহমান সরকারের সামনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—বাংলাদেশ কি নতুন কোনো প্রতিরক্ষা জোটে যুক্ত হবে?
সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের সাম্প্রতিক যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশ ইতিবাচক আগ্রহ দেখিয়েছে। তবে কোনো জোটে যোগ দেওয়ার আগে শুধু সম্ভাব্য লাভ নয়, ভবিষ্যতের দায়ও বিবেচনা করা জরুরি।
বাংলাদেশ আক্রান্ত হলে অন্য সদস্যরা কী করবে? ভারত-পাকিস্তান সংঘাত হলে বাংলাদেশের অবস্থান কী হবে? মধ্যপ্রাচ্যে বড় কোনো সংঘাত শুরু হলে বাংলাদেশকে কি কোনো পক্ষ নিতে হবে? পাঁচ বা দশ বছর পর পরিস্থিতি বদলে গেলে বাংলাদেশ কি নিজের অবস্থান পরিবর্তন করতে পারবে?
এসব প্রশ্নের উত্তর না জেনে কোনো নিরাপত্তা জোটে প্রবেশ করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
কারণ, একটি দেশের সঙ্গে বাণিজ্য করা আর সেই দেশের নিরাপত্তাজনিত দায় ভাগ করে নেওয়া এক বিষয় নয়।
বাংলাদেশের কৌশল কী হতে পারে?
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হতে পারে ভারসাম্যপূর্ণ ও বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতি।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কে ‘স্ট্র্যাটেজিক হেজিং’ নামে একটি ধারণা রয়েছে। সহজ ভাষায়, কোনো একটি শক্তির ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে একাধিক দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা এবং নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা ধরে রাখা।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এই কৌশল গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
ভারতের সঙ্গে সহযোগিতা থাকবে, কিন্তু চীন, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ইউরোপ, সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার স্বাধীনতাও থাকবে।
তবে এই সম্পর্কগুলো যেন একে অপরের বিরুদ্ধে জোট হিসেবে ব্যবহৃত না হয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বিকল্প তৈরি করা আর কাউকে চাপ দেওয়ার জন্য বিকল্প ব্যবহার করা—দুই বিষয় এক নয়।
তারেক রহমানের সামনে মূল পরীক্ষা
তারেক রহমানের সামনে তাই পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে—নতুন বন্ধু তৈরি করা, পুরোনো সম্পর্ককে বাস্তবতার আলোকে পুনর্গঠন করা এবং একই সঙ্গে বাংলাদেশের কৌশলগত স্বাধীনতা ধরে রাখা।
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের দাবি থাকবে, কিন্তু সেটিই যেন পুরো ভারতনীতিকে নিয়ন্ত্রণ না করে। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে, তবে তা যেন বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের বিনিময়ে না হয়।
চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়বে, কিন্তু নতুন কোনো নির্ভরতা তৈরি করা যাবে না। প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়তে পারে, কিন্তু এমন কোনো জোটে যাওয়া যাবে না, যার দায় ভবিষ্যতে বাংলাদেশের কূটনৈতিক স্বাধীনতা সীমিত করে।
সবশেষে, ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির বাস্তব পরীক্ষা এখানেই—কোনো এক পক্ষের সঙ্গে পুরোপুরি না গিয়ে, সবার সঙ্গে সম্পর্ক রেখে বাংলাদেশের স্বার্থে সর্বোচ্চ সুবিধা আদায় করা।
কারণ বাংলাদেশের শক্তি শুধু তার মিত্রদের সংখ্যায় নয়; বরং নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার সক্ষমতায়।
